বাগেরহাট জেলা: মসজিদের নগরী থেকে সুন্দরবনের কিনারা
খুলনা বিভাগ · ৯টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
ভৈরব নদের বাঁকে দাঁড়িয়ে যদি কেউ কল্পনা করেন, প্রায় ছয়শো বছর আগে এখানে ছিল ঘন জঙ্গল, বাঘের ডাক আর লোনা জলের জোয়ার, তাহলে বাগেরহাটকে বোঝা সহজ হয়। পঞ্চদশ শতকে এক সাধক-সেনানায়ক সেই জঙ্গল কেটে গড়ে তুলেছিলেন দিঘি, সড়ক আর একের পর এক মসজিদ। সেই শহরের নাম ছিল খলিফাতাবাদ। আজকের বাগেরহাট জেলা সেই পুরোনো নগরীর উত্তরসূরি, যার দক্ষিণ সীমানা গিয়ে মিশেছে সুন্দরবন আর বঙ্গোপসাগরে। খুলনা বিভাগের এই জেলায় ইট-পাথরের ইতিহাস আর নোনা পানির জীবিকা পাশাপাশি চলে।
নামের পেছনের কয়েকটি গল্প
বাগেরহাট নামটি কে দিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেন না। প্রচলিত আছে, কাছের সুন্দরবনে এক সময় বাঘের উপদ্রব এত বেশি ছিল যে লোকমুখে জায়গাটির নাম হয়ে যায় "বাঘের হাট"। আরেকটি মত বলে, খান জাহান আলীর আমলে এখানে বড় বড় বাগান ছিল, সেই "বাগ" থেকে নামের শুরু। তবে স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় যে ব্যাখ্যাটি বেশি গ্রহণযোগ্য ধরা হয়, তা হলো ভৈরব নদের একটি বাঁকে বসা হাট। নদীর বাঁকে বসত বলে লোকে বলত "বাঁকের হাট", কালক্রমে মুখে মুখে তা বাগেরহাট হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনটি গল্পের কোনোটিই দলিল দিয়ে প্রমাণিত নয়, কিন্তু প্রত্যেকটিতেই জেলার চরিত্রের একটা টুকরো ধরা আছে: বন, বাগান আর নদী।
খান জাহান আলী ও খলিফাতাবাদ
বাগেরহাটের ইতিহাস বললে প্রথমেই আসে খান জাহান আলীর নাম। পঞ্চদশ শতকে তিনি এই অঞ্চলে বসতি গড়েন, জঙ্গল সাফ করেন, রাস্তা বানান এবং পানির কষ্ট মেটাতে বিশাল সব দিঘি খনন করান। তাঁর হাতে গড়া জনপদই খলিফাতাবাদ নামে পরিচিত ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর শহরটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে জঙ্গলে ঢেকে যায়। শতাব্দী পেরিয়ে সেই ধ্বংসাবশেষ আবার আলোয় আসে।
খান জাহানের সময়কার স্থাপত্যের সবচেয়ে বড় নিদর্শন ষাট গম্বুজ মসজিদ। পোড়ামাটির ইটে তৈরি এই বিশাল মসজিদের নাম ষাট গম্বুজ হলেও ছাদে গম্বুজের সংখ্যা আসলে তার চেয়ে বেশি। ভেতরে সারি সারি পাথরের স্তম্ভ, চার কোণে গোল মিনার, দেয়াল এতটাই পুরু যে ভেতরে গ্রীষ্মেও একটা শীতলতা থাকে। মসজিদ ও আশপাশের স্থাপনাগুলো মিলিয়ে "মসজিদের শহর বাগেরহাট" ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়। কাছেই রয়েছে খান জাহান আলীর সমাধি এবং তার পাশের ঠাকুর দিঘি, যার কুমিরগুলো নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা কাহিনি চালু আছে।
পরবর্তী সময়ে অঞ্চলটি মুঘল ও পরে ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে আসে, দীর্ঘদিন এটি খুলনার একটি মহকুমা ছিল। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ধারায় ১৯৮৪ সালে বাগেরহাট পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
একাত্তরের দিনগুলো
মুক্তিযুদ্ধে বাগেরহাট ছিল ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে। জেলার নানা জায়গায় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের হাতে গণহত্যা হয়েছে, কচুয়া, রামপাল, শরণখোলা, ফকিরহাটের গ্রামগুলো সেই ক্ষত আজও বহন করে। মোল্লাহাটের চাকুলিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বড় এক সংঘর্ষের কথা স্থানীয় ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখ আছে। জেলাজুড়ে বেশ কয়েকটি গণকবর ও বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে, সেখানে স্মৃতিস্তম্ভও গড়া হয়েছে।
নদী, লোনা জল আর জীবিকা
বাগেরহাটের মানচিত্র আসলে নদীর জাল। পশুর, মধুমতী, বলেশ্বর, ভৈরব, হরিণঘাটা, মোংলা, পানগুছি: এসব নদী জোয়ার-ভাটায় জেলার মাটি গড়েছে। উত্তরের দিকে ধান, নারকেল আর সুপারির বাগান, দক্ষিণে যত এগোবেন ততই পানি লোনা হতে থাকে, আর মাঠের জায়গা নেয় চিংড়ির ঘের।
রামপাল, ফকিরহাট, মোংলা অঞ্চলে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ বহু পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। দেশের অন্যতম প্রধান সমুদ্রবন্দর মোংলা এই জেলাতেই, পশুর নদের তীরে। শরণখোলা আর মোংলার মানুষের একটা অংশ সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে বাঁচেন: মধু সংগ্রহ, গোলপাতা কাটা, মাছ ও কাঁকড়া ধরা। শীতে দুবলার চরে শুঁটকির মৌসুম চলে, তখন সাগরপাড়ের সেই চরে জেলেদের অস্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে। ঘূর্ণিঝড় আর লবণাক্ততা এই জীবনের নিত্যসঙ্গী, তবু মানুষ নদীর সঙ্গেই টিকে থাকার কৌশল শিখে নিয়েছে।
মানুষ, গান আর ভিটার স্মৃতি
বাগেরহাটের গ্রামীণ সংস্কৃতিতে গাজীর গান, মেয়েলি গীত আর চৈত্র সংক্রান্তির অষ্টক গানের চল ছিল জোরালো। সুন্দরবনের কাছের গ্রামগুলোতে বনবিবি আর গাজী পীরকে ঘিরে লোকবিশ্বাস আজও বেঁচে আছে, জঙ্গলে ঢোকার আগে অনেকে এখনো মানত করেন। বাংলা কবিতার প্রতিবাদী কণ্ঠ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর পৈতৃক বাড়ি মোংলার মিঠেখালি গ্রামে, শৈশবের অনেকটা সময় তাঁর কেটেছে এই নদীঘেরা জনপদে। হাটে-মাঠে এখনো হাতে বোনা মাদুর, নারকেলের ছোবড়ার দড়ি আর গোলপাতার ছাউনির কাজ চোখে পড়ে, যা এ অঞ্চলের নিজস্ব কারিগরির পরিচয়।
যেসব জায়গায় একবার দাঁড়ানো দরকার
- ষাট গম্বুজ মসজিদ ও পাশের জাদুঘর, যেখানে খলিফাতাবাদের নানা প্রত্নবস্তু রাখা আছে
- খান জাহান আলীর সমাধি ও ঠাকুর দিঘি
- এক গম্বুজের রণবিজয়পুর মসজিদ, নয় গম্বুজ মসজিদ, সিংগাইর মসজিদ ও চুনাখোলা মসজিদ
- মোংলা বন্দর ও সেখান থেকে নৌপথে সুন্দরবনের করমজল
- শরণখোলা হয়ে সুন্দরবনের গভীরে কটকা ও কচিখালীর দিক
একদিনে মসজিদগুলো রিকশায় ঘুরে দেখা যায়, আর সুন্দরবন দেখতে চাইলে মোংলা থেকে লঞ্চ বা ট্রলারে উঠে বনের ভেতর রাত কাটানোর আয়োজনও হয়।
চিংড়ির ঝোল, নারকেলের দুধ আর চুইয়ের ঝাল
যে জেলার মাঠে মাঠে চিংড়ির ঘের, সেখানকার রান্নাঘরে চিংড়ি যে রাজা হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বাগেরহাটের গৃহস্থ বাড়িতে বড় গলদা চিংড়ি নারকেলের দুধে রেঁধে যে মালাইকারি হয়, তার ঘন, মিষ্টি-ঝাল স্বাদ অতিথির পাতে তুলে দেওয়া এ অঞ্চলের এক ধরনের সম্মান। নারকেল এখানে সহজলভ্য বলে ঝোলের ঘনত্বে আলাদা একটা মোলায়েম ভাব থাকে। প্রতিদিনের খাবারে আরও বেশি দেখা যায় চিংড়ি ভুনা: পেঁয়াজ, রসুন আর মরিচে কষানো, ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য একটু শুকনো করে রাঁধা।
লোনা জলের আরেক উপহার কাঁকড়া। নদী আর সুন্দরবনের খাল থেকে ধরা কাঁকড়া এখন অনেকে ঘেরেও চাষ করেন। ঝাল মসলায় কাঁকড়া ভুনা স্থানীয় হোটেলেও মেলে। এর সঙ্গে আছে চুইঝাল দিয়ে রাঁধা মাংস, খুলনা অঞ্চলের এই চেনা স্বাদ বাগেরহাটেও সমান জনপ্রিয়। শীতে দুবলার চরের শুঁটকি আর সুন্দরবনের মধু বাজারে আসে। জেলার খাবার নিয়ে বিস্তারিত দেখতে পারেন বাগেরহাটের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাওয়ার পথ ও ভালো সময়
ঢাকা থেকে বাগেরহাটে সাধারণত সড়কপথে যাওয়া হয়, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর বাসে যাত্রার সময় অনেকটা কমেছে। খুলনা পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথেও আসা যায়। ঘোরার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি: আবহাওয়া শুকনো, নদী শান্ত, আর সুন্দরবনে ভ্রমণের মৌসুমও তখনই। বর্ষায় মসজিদগুলোর চারপাশ সবুজ হয়ে ওঠে ঠিকই, কিন্তু বৃষ্টি আর জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি মাথায় রাখতে হয়।
সাধারণ প্রশ্ন
বাগেরহাট কেন বিখ্যাত?
বাগেরহাট মূলত খান জাহান আলীর গড়া ঐতিহাসিক মসজিদের শহর, বিশেষ করে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ষাট গম্বুজ মসজিদের জন্য বিখ্যাত। পাশাপাশি মোংলা বন্দর, সুন্দরবন আর চিংড়ি চাষের জন্যও জেলাটি পরিচিত।
ষাট গম্বুজ মসজিদ কবে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ওঠে?
ষাট গম্বুজ মসজিদসহ মসজিদের শহর বাগেরহাট ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।
বাগেরহাটে গেলে কী খাওয়া উচিত?
গলদা চিংড়ির মালাইকারি, চিংড়ি ভুনা আর ঝাল কাঁকড়া এখানকার সবচেয়ে পরিচিত স্বাদ। শীতে গেলে সুন্দরবনের মধু আর শুঁটকিও খুঁজে দেখতে পারেন।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh