বান্দরবান জেলা: পাহাড়, মেঘ আর বহু জাতির ঘর
চট্টগ্রাম বিভাগ · ৭টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
শীতের ভোরে নীলগিরির চূড়ায় দাঁড়ালে মনে হয় পায়ের নিচে সাদা সমুদ্র। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা মেঘ ধীরে ধীরে সরে যায়, আর রোদ উঠলে দেখা দেয় একের পর এক সবুজ ঢেউ। বান্দরবান (Bandarban) বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়গুলোর ঘর। দেশের উচ্চতম চূড়াগুলো এই জেলাতেই, আর এখানকার পাহাড়ে বহু শতাব্দী ধরে বাস করছে মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, তঞ্চঙ্গ্যা, খুমিসহ নানা জাতিগোষ্ঠী। তিন পার্বত্য জেলার একটি এই বান্দরবানে ভাষা, পোশাক, উৎসব আর খাবার, সবকিছুতেই বৈচিত্র্য।
বানর আর বাঁধের কিংবদন্তি
বান্দরবান নামের পেছনে একটি মজার লোককথা প্রচলিত আছে, যা জেলা প্রশাসনের তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়, একসময় এই এলাকায় অসংখ্য বানর থাকত। শহরের প্রবেশমুখের এক ছড়ার ওপারের পাহাড়ে তারা লবণ খেতে যেত। একবার টানা বৃষ্টিতে ছড়ার পানি বেড়ে গেলে বানরের দল আর পার হতে পারছিল না। তখন তারা একে অপরকে ধরে সারি বেঁধে সেতুর মতো তৈরি করে ছড়া পার হয়। স্থানীয়রা এই দৃশ্য দেখে জায়গাটিকে ডাকতে শুরু করেন 'মাওক্কি ছড়া' নামে। মারমা ভাষায় 'মাক' মানে বানর আর 'চি' মানে বাঁধ। মুখে মুখে সেই নাম বাংলায় বদলে হয়ে যায় বান্দরবান।
এটি কিংবদন্তি, ঐতিহাসিক দলিল নয়। তবে পাহাড়ি জনপদের নামকরণে প্রকৃতি আর প্রাণীর এমন ভূমিকা এই অঞ্চলের মানুষের জীবনদৃষ্টির সঙ্গে মিলে যায়।
বোমাং রাজা ও পার্বত্য ইতিহাস
বান্দরবানের ইতিহাসের কেন্দ্রে আছে বোমাং সার্কেল। পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহ্যগতভাবে তিনটি সার্কেলে ভাগ, আর বান্দরবান অঞ্চল বোমাং সার্কেলের অধীনে। মারমা জাতিগোষ্ঠীর বোমাং রাজপরিবার কয়েক শতাব্দী ধরে এই সার্কেলের প্রধান। ব্রিটিশ আমলে ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির মাধ্যমে সার্কেল ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিক রূপ পায়, যাতে রাজা, হেডম্যান আর কারবারিদের হাতে খাজনা আদায় ও প্রথাগত বিচারের দায়িত্ব থাকে। বান্দরবান শহরে বোমাং রাজবাড়ি আজও আছে।
একসময় বান্দরবান ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার একটি মহকুমা। ১৯৮১ সালে লামা ও বান্দরবান মহকুমা নিয়ে আলাদা পার্বত্য জেলা গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলেও পাকিস্তানি বাহিনী অত্যাচার চালিয়েছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু পাড়া ও সোনাইছড়ি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী শিবির ছিল।
পাহাড়, নদী আর জুম
বান্দরবানের ভূপ্রকৃতি পুরোটাই পাহাড়ি। সরকারি হিসাবে দেশের সর্বোচ্চ চূড়া তাজিংডং আর দ্বিতীয় কেওক্রাডং দুটোই এই জেলায়। অনানুষ্ঠানিক হিসাবে সবচেয়ে উঁচু বলে পরিচিত সাকা হাফংও এখানকার সীমান্তবর্তী পাহাড়ে। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে সাঙ্গু আর মাতামুহুরী নদী। সাঙ্গু নিয়ে বলা হয়, এটি দেশের হাতে গোনা নদীগুলোর একটি যা দক্ষিণ থেকে উত্তরে বয়ে চলে, পরে বাঁক নিয়ে সাগরে মেশে। থানচি থেকে রেমাক্রির পথে সাঙ্গুর পাথুরে খরস্রোতে নৌকা চালানো এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
পাহাড়ের ঢালে জুম চাষ এখানকার পুরোনো কৃষিপদ্ধতি। এক জমিতে একসঙ্গে ধান, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, মরিচ, তিল আর নানা সবজি বোনা হয়। এর পাশাপাশি আনারস, কলা, পেঁপে আর আমের বাগান এখন বড় আয়ের উৎস। কৃষিই জেলার মানুষের প্রধান জীবিকা, সঙ্গে পর্যটন দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে।
উৎসব আর জীবনের রং
বান্দরবানের উৎসবগুলোতে পাহাড়ের বহু জাতির সংস্কৃতি একসঙ্গে দেখা যায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি মারমাদের নববর্ষ সাংগ্রাই, তখন সাঙ্গুর পাড়ে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে পুরোনো বছরকে বিদায় জানায়। ত্রিপুরাদের বৈসু আর অন্যদের নববর্ষের উৎসবও কাছাকাছি সময়ে পালিত হয়।
আশ্বিনী পূর্ণিমায় প্রবারণা উৎসবে, যাকে মারমারা ওয়াগ্যোয়াই পোয়ে বলেন, রাতের আকাশে ওড়ানো হয় শত শত ফানুস, আর শহরের পথে সাজানো রথ টানার আয়োজন হয়। আর বোমাং সার্কেলের ঐতিহ্যবাহী রাজপুণ্যাহ উৎসবে হেডম্যান-কারবারিরা প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করা জুমের খাজনা রাজার হাতে তুলে দেন, রাজবাড়ির মাঠে তখন মেলা বসে। ম্রোদের বাঁশির সুর আর বাঁশ নৃত্য, মারমাদের থালা নৃত্য, এসব উৎসবেরই অংশ।
পাহাড়ি পাড়াগুলোর ঘরবাড়িও চোখে পড়ার মতো। অনেক জাতিগোষ্ঠী বাঁশ আর কাঠ দিয়ে মাটি থেকে উঁচু মাচাং ঘর বানায়, যার নিচে থাকে গবাদিপশু বা জ্বালানি কাঠ। পাড়ার প্রধানকে বলা হয় কারবারি, আর প্রথাগত নানা বিরোধ মেটানো হয় তাঁর মাধ্যমেই। নারীদের হাতে কোমর তাঁতে বোনা রঙিন কাপড় প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব নকশা বহন করে, যা দেখে অনেক সময় বলে দেওয়া যায় কে কোন জাতির মানুষ।
বান্দরবানের দর্শনীয় স্থান
বান্দরবানের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় দেখার মতো কিছু না কিছু আছে। জেলা শহরের কাছে মেঘলা ও নীলাচল দিয়ে শুরু করা যায়। নীলাচল থেকে সন্ধ্যায় শহরের আলো আর দূরের পাহাড় দেখা যায়। শহরের উপকণ্ঠে পাহাড়ের চূড়ায় বুদ্ধ ধাতু জাদি, যা স্বর্ণমন্দির নামে বেশি পরিচিত, থেরবাদী বৌদ্ধ স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।
শহর থেকে থানচির পথে চিম্বুক আর নীলগিরি, দুটোই মেঘ দেখার জন্য বিখ্যাত। রুমা উপজেলার বগা লেক পাহাড়ের চূড়ায় এক রহস্যময় হ্রদ, যার উৎপত্তি নিয়েও নানা লোককথা আছে। সেখান থেকে হেঁটে কেওক্রাডং যাওয়া যায়। আর থানচির রেমাক্রি পেরিয়ে নাফাখুম জলপ্রপাত বর্ষায় রেমাক্রি খালের পানি নিয়ে গর্জে ওঠে।
পাহাড়ি রান্নাঘর
বান্দরবানের খাবার পাহাড়ের মতোই আলাদা। বর্ষা শুরু হলে বাঁশঝাড় থেকে উঁকি দেয় কচি বাঁশের ডগা, যাকে বলে বাঁশ কোড়ল। পাহাড়ি রান্নায় এটি অত্যন্ত প্রিয় উপকরণ: ছোট করে কেটে সেদ্ধ করে চিংড়ি বা মাছের সঙ্গে রান্না, কিংবা মরিচ দিয়ে ভর্তা। অনেক জাতিগোষ্ঠীর রান্নায় মাছ বা চিংড়ি গাঁজিয়ে তৈরি নাপ্পি স্বাদের মূল ভিত্তি। বাঁশের চোঙায় মুরগি বা মাছ ভরে আগুনে পুড়িয়ে রান্নার রীতিও পাহাড়ে প্রচলিত।
গ্রীষ্ম আর বর্ষায় পাহাড়ের ঢালজুড়ে আনারস পাকে। পথের ধারে স্তূপ করে রাখা রসালো আনারস কেটে লবণ-মরিচ দিয়ে খাওয়া বান্দরবান ভ্রমণের সবচেয়ে সহজ আনন্দগুলোর একটি। আর দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কোনো পাড়ার দোকানে বসে এক কাপ গরম দুধ চা, ক্লান্তি মুছে দিতে এর জুড়ি নেই। আরও জানতে দেখুন বান্দরবানের বিখ্যাত খাবার।
যাতায়াত ও ভ্রমণের মৌসুম
ঢাকা থেকে বান্দরবানে সড়কপথে সরাসরি বাস চলে। অনেকে ট্রেনে বা আকাশপথে চট্টগ্রাম পৌঁছে সেখান থেকে বাসে বান্দরবান যান। জেলার ভেতরে দুর্গম এলাকায় যেতে স্থানীয় জিপ আর নৌকাই ভরসা, আর কিছু এলাকায় যেতে প্রশাসনের অনুমতি বা নির্দেশনা মানতে হয়।
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি ঘোরার সবচেয়ে ভালো সময়, তখন আকাশ পরিষ্কার আর ট্রেকিং তুলনামূলক নিরাপদ। বর্ষায় ঝরনাগুলো পূর্ণ রূপে থাকে, তবে তখন পাহাড়ধস আর পিচ্ছিল পথের ঝুঁকি মাথায় রাখতে হয়।
সাধারণ প্রশ্ন
বান্দরবান নামের অর্থ কী?
প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, বানরের দল সারি বেঁধে ছড়া পার হওয়ার ঘটনা থেকে মারমা ভাষায় 'বানরের বাঁধ' অর্থে নামটি এসেছে।
বান্দরবানে কোন পাহাড়ি খাবার খাওয়া উচিত?
বাঁশ কোড়লের তরকারি, বাঁশের চোঙায় রান্না করা মুরগি আর পাহাড়ের টাটকা আনারস বান্দরবানের স্বাদের পরিচয়।
বান্দরবান ঘোরার সেরা সময় কখন?
আকাশ পরিষ্কার আর পথ শুকনো থাকায় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি বান্দরবান ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh