ভোলা জেলা: মেঘনার বুকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ
বরিশাল বিভাগ · ৭টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
মানচিত্রে ভোলাকে দেখতে লাগে মেঘনার মোহনায় ভেসে থাকা একটা লম্বা পাতার মতো। পুবে মেঘনা, পশ্চিমে তেঁতুলিয়া, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, চারদিকে পানি আর পানির মাঝে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। ভোলা (Bhola) জেলার মানুষের জীবনে নদী একই সঙ্গে দাতা আর শাসক। নদী পলি দিয়ে নতুন চর গড়ে, আবার পাড় ভেঙে গ্রাম গিলে খায়। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই এখানে গড়ে উঠেছে ইলিশ ধরার বিশাল জগৎ, চরের বাথানে মহিষের পাল আর মাটির হাঁড়িতে জমানো টক দইয়ের ঐতিহ্য।
ভোলা গাজীর খেয়াঘাট: নামের গল্প
ভোলা নামের পেছনে যে গল্পটা সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, সেটি এক বুড়ো মাঝির। প্রচলিত আছে, আজকের ভোলা শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া বেতুয়া খাল একসময় বেশ চওড়া নদী ছিল। সেখানে খেয়া পারাপার করতেন ভোলা গাজী নামের এক বৃদ্ধ মাঝি। মানুষের মুখে মুখে ঘাটটির পরিচয় হয়ে যায় তাঁর নামে, আর সেখান থেকেই একসময় পুরো দ্বীপের নাম হয় ভোলা। কোনো কোনো বর্ণনায় মাঝির নাম ভোলানাথ বলেও উল্লেখ আছে।
ভোলা নামটা অবশ্য তুলনামূলক নতুন। আগে দ্বীপটি পরিচিত ছিল দক্ষিণ শাহবাজপুর নামে। আজও জেলার গ্যাসক্ষেত্র আর পুবের নৌপথের নামে সেই পুরোনো পরিচয় টিকে আছে।
চর থেকে জেলা: ভোলার ইতিহাস
জে সি জ্যাকের বাকেরগঞ্জ গেজেটিয়ারের বরাতে বলা হয়, ত্রয়োদশ শতকে দ্বীপটি জাগতে শুরু করে এবং চতুর্দশ শতকের শুরুর দিকে চাষাবাদ শুরু হয়। ষোড়শ শতকের দিকে পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুরা এই দ্বীপ ও আশপাশে ঘাঁটি গেড়েছিল বলে জানা যায়।
ব্রিটিশ আমলে প্রশাসনিক দিক থেকে দ্বীপটির অবস্থান কয়েকবার বদলেছে। শাহবাজপুর প্রথমে বাকেরগঞ্জ জেলার অংশ ছিল, পরে নদীর গতিপথ বদলে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়লে একে নোয়াখালীর অধীনে নেওয়া হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ১৮৪৫ সালে নোয়াখালীর অধীনে মহকুমা হিসেবে এর যাত্রা শুরু, সদর ছিল দৌলতখানে। ১৮৬৯ সালে মহকুমাটি বরিশালের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং ১৮৭৬ সালে সদর দপ্তর দৌলতখান থেকে সরিয়ে ভোলায় আনা হয়। ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভোলা পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
সত্তরের ঘূর্ণিঝড় আর একাত্তর
ভোলার নাম বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়েছিল এক মর্মান্তিক কারণে। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ইতিহাসে 'ভোলা ঘূর্ণিঝড়' নামে পরিচিত। উপকূলজুড়ে লাখো মানুষের প্রাণ যায়, ভোলার বহু চর মানুষশূন্য হয়ে পড়ে। সেই বিপর্যয়ে তৎকালীন সরকারের উদাসীনতা পূর্ব বাংলার মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
পরের বছর মুক্তিযুদ্ধে ভোলার মানুষ সরাসরি লড়াইয়ে নামেন। বাংলাপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর বোরহানউদ্দিনের দেউলা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২৭ অক্টোবর ভোলা শহর থেকে কিছু দূরে টনির হাটে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা হয়, পরে জায়গাটির নাম রাখা হয় বাংলাবাজার। ঘুইংগারহাট, চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন আর দৌলতখানেও লড়াই ও হত্যাকাণ্ডের কথা লিপিবদ্ধ আছে।
সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন, সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ভোলার সন্তান হিসেবে পরিচিত। ভোলা সদরের আলীনগরে তাঁর নামে স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হয়েছে।
নদী, চর আর জীবিকা
ভোলার মাটি পুরোপুরি পলি দিয়ে গড়া, তাই এখানে চাষাবাদ ভালো হয়। ধান, সুপারি, নারকেল আর রবিশস্য প্রধান ফসল। জেলার মানুষের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস কৃষি। তবে ভোলার আসল পরিচয় মাছ। মেঘনা আর তেঁতুলিয়ার মোহনায় দেশের ইলিশের বড় একটা অংশ ধরা পড়ে, আর হাজারো জেলে পরিবারের রুটিরুজি এই ইলিশকে ঘিরে। ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞার সময় নদী থাকে প্রায় শান্ত, আর মৌসুম খুললে ঘাটে ঘাটে উৎসবের মতো ভিড়।
চরাঞ্চলে বিশাল বাথানে মহিষ পালন ভোলার আরেক পুরোনো জীবিকা। ভোলার মাটির নিচে প্রাকৃতিক গ্যাসও আছে। বোরহানউদ্দিনের শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র জেলার অর্থনৈতিক মানচিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মানুষ ও লোকজ সংস্কৃতি
ভোলার মানুষ নদীর সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে শিখেছেন, আর সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের গানে-গল্পে মিশে আছে। পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, লালনগীতি, পালাগান আর কবিগানের আসর গ্রামাঞ্চলে জনপ্রিয় ছিল। হিন্দু সম্প্রদায়ের শিবের গাজন আর চড়ক পূজা, বছরের শুরুতে ব্যবসায়ীদের হালখাতা, এসব উৎসব জেলার সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী নলিনী দাসও এই জেলার মানুষ।
ভোলায় ঘোরার জায়গা
ভোলার সৌন্দর্য মূলত তার চর আর ম্যানগ্রোভে। চরফ্যাশনের দক্ষিণে চর কুকরি-মুকরি একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, যেখানে কেওড়া আর গেওয়ার বনে হরিণ, বানর আর নানা পাখির দেখা মেলে। আরও দক্ষিণে ঢালচরের কাছে তারুয়া সৈকত, যেখানে সাগর, বন আর বালুচর একসঙ্গে দেখা যায়।
মনপুরা দ্বীপ মেঘনার বুকে আলাদা এক জনপদ, শীতে অতিথি পাখি আর ভোরের সূর্যোদয়ের জন্য পরিচিত। চরফ্যাশন শহরের জ্যাকব টাওয়ার থেকে চারপাশের সবুজ চর আর নদী দেখা যায় অনেক দূর পর্যন্ত। এ ছাড়া বোরহানউদ্দিন চৌধুরীর পুরোনো জমিদারবাড়ি আর ভোলা সদরের মোস্তফা কামাল স্মৃতি জাদুঘরও ঘুরে দেখার মতো।
ভোলার রান্নাঘর: দই, ইলিশ আর শুঁটকি
ভোলার কোনো বিয়েবাড়িতে গেলে খাওয়ার শেষে মাটির পাত্রে আসবে সাদা, ঘন, একটু টক মহিষের দই। চরের বাথানে চরে বেড়ানো মহিষের কাঁচা দুধ মাটির পাত্রে ঢেলে রেখে দেওয়া হয় অনেক ঘণ্টা, তাতে জমে ওঠে এমন দই যার ওপর পুরু সরের স্তর। কেউ খান চিনি বা খেজুরের গুড় মিশিয়ে, কেউ টকটাই পছন্দ করেন, কেউ আবার মুড়ির সঙ্গে মেখে নেন। বহু প্রজন্ম ধরে এই দই ভোলার আতিথেয়তার প্রতীক, হাটে হাটে মাটির পাত্রে সাজিয়ে বিক্রি হয়।
ইলিশ এখানে বিলাসিতা নয়, প্রতিদিনের খাবার। মেঘনা থেকে সদ্য তোলা ইলিশ ভাজা, ইলিশের ডিম ভুনা আর ইলিশের মাথা দিয়ে শাক বা ডাল, ভোলার মানুষের প্রিয় পদ। শীতকালে চরগুলোতে সামুদ্রিক ও নদীর মাছ শুকিয়ে শুঁটকি বানানো হয়, যা ঝাল ভুনা বা ভর্তা করে খাওয়া হয়।
ভোলার আরও খাবার আর কোথায় কী পাওয়া যায় জানতে দেখুন ভোলার বিখ্যাত খাবার।
কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন
দ্বীপ জেলা বলে ভোলায় যাওয়ার প্রধান পথ নদী। ঢাকার সদরঘাট থেকে রাতের লঞ্চে সরাসরি ভোলায় যাওয়া যায়। সড়কপথে গেলে পদ্মা সেতু হয়ে বরিশাল পৌঁছে সেখান থেকে ফেরি বা লঞ্চে তেঁতুলিয়া পার হতে হয়।
ঘোরার জন্য শীতকাল সবচেয়ে উপযোগী। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে নদী শান্ত থাকে, চরে অতিথি পাখি আসে আর মনপুরা বা কুকরি-মুকরি যাওয়া নিরাপদ হয়। ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে বর্ষার শেষ ভাগ ভালো, তবে তখন নদীপথে আবহাওয়ার সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।
সাধারণ প্রশ্ন
ভোলা জেলার আগের নাম কী ছিল?
ভোলা দ্বীপটি আগে দক্ষিণ শাহবাজপুর নামে পরিচিত ছিল, আর এটি ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।
ভোলার মহিষের দই কেন বিখ্যাত?
চরে পালিত মহিষের ঘন দুধ মাটির পাত্রে জমিয়ে তৈরি এই দই পুরু সর আর হালকা টক স্বাদের জন্য বহু প্রজন্ম ধরে পরিচিত।
ভোলায় প্রকৃতি দেখতে কোথায় যাওয়া যায়?
চর কুকরি-মুকরির ম্যানগ্রোভ বন, তারুয়া সৈকত আর মনপুরা দ্বীপ ভোলার সবচেয়ে পরিচিত প্রাকৃতিক গন্তব্য।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh