Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

বগুড়া জেলা: পুণ্ড্রনগরের মাটি, দইয়ের ঘ্রাণ

রাজশাহী বিভাগ · ১২টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. বগুড়া নামের পেছনের সুলতান
  2. পুণ্ড্রবর্ধন থেকে আধুনিক জেলা
  3. করতোয়া, যমুনা আর আলুর মাঠ
  4. লোকগান, বেহুলার গল্প আর মানুষ
  5. যেখানে ঘুরে আসা যায়
  6. বগুড়ার স্বাদ: সরা, কটকটি আর ভর্তা
  7. কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন
  8. সাধারণ প্রশ্ন

করতোয়ার পাড়ে দাঁড়িয়ে মহাস্থানগড়ের উঁচু মাটির প্রাচীরের দিকে তাকালে মনে হয়, এখানে মাটির প্রতিটি স্তরে একেকটা শতাব্দী চাপা পড়ে আছে। আবার শহরের সাতমাথায় ফিরে এলে দেখা যায় মাটির সরায় জমানো লালচে দই হাতে হাতে ঘুরছে। বগুড়া জেলা এই দুই ছবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে। একদিকে বাংলার সবচেয়ে পুরোনো নগর-ধ্বংসাবশেষের একটি, অন্যদিকে সারা দেশে পরিচিত এক মিষ্টি স্বাদ। রাজশাহী বিভাগের এই জেলাকে অনেকে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বলেন, কারণ ঢাকা থেকে রংপুর-দিনাজপুরের দিকে যাওয়ার পথ বগুড়ার ভেতর দিয়েই এগোয়।

বগুড়া নামের পেছনের সুলতান

বগুড়ার নাম এসেছে বাংলার এক শাসকের নাম থেকে, এ কথা সাধারণভাবে স্বীকৃত। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের পুত্র নাসিরউদ্দিন বুগরা খান ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিকে বাংলার শাসক ছিলেন। তাঁর নাম থেকেই অঞ্চলটির নাম হয় ‘বগড়া’, ইংরেজিতে লেখা হতো বগরা। দীর্ঘদিন সেই বানানই চালু ছিল। পরে বাংলা উচ্চারণের সঙ্গে মিলিয়ে সরকারি নাম হয় বগুড়া।

পুণ্ড্রবর্ধন থেকে আধুনিক জেলা

বগুড়ার ইতিহাস বলতে গেলে প্রথমে আসে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন। শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানগড়কে গবেষকেরা প্রাচীন পুণ্ড্রনগর বলে শনাক্ত করেছেন। এখানে পাওয়া ব্রাহ্মী লিপির একটি শিলালেখ বাংলাদেশে পাওয়া প্রাচীনতম লিপিগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। করতোয়ার পশ্চিম তীরে প্রায় আয়তাকার এক দুর্গনগর, চারপাশে উঁচু মাটি ও ইটের প্রাচীর; ভেতরে আর আশপাশে ছড়িয়ে আছে মন্দির, বিহার আর বসতির ঢিবি। খননে পাওয়া মৃৎপাত্র, মুদ্রা আর পোড়ামাটির ফলক দেখায়, শতাব্দীর পর শতাব্দী এখানে মানুষ বাস করেছে, ব্যবসা করেছে, উপাসনা করেছে। মহাস্থানের জাদুঘরে সেসব নিদর্শনের একটি বড় অংশ সাজানো আছে, যা দেখলে প্রাচীন বাংলার নগরজীবনের একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। মৌর্য যুগ থেকে শুরু করে গুপ্ত, পাল ও সেন আমল পর্যন্ত নানা শাসনের চিহ্ন এই অঞ্চলের মাটিতে মিলেছে। পরে সুলতানি ও মুঘল আমলে এলাকাটি বাংলার শাসনকেন্দ্রের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত থাকে। শেরপুরের খেরুয়া মসজিদ সেই মুঘল যুগের সাক্ষী, ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে তৈরি এই ছোট্ট মসজিদের মোটা দেয়াল আর বাঁকানো কার্নিশ এখনো দেখার মতো।

ব্রিটিশ আমলে ১৮২১ সালে রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুরের কয়েকটি থানা মিলিয়ে বগুড়া জেলা গঠিত হয়। শহরের পৌরসভা হয় উনিশ শতকের শেষ দিকে। ১৯৮৩ সালে জেলার একটি অংশ আলাদা হয়ে জয়পুরহাট জেলা গড়ে ওঠে। এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছিলেন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। বগুড়ার নবাব পরিবারের সন্তান মোহাম্মদ আলী বগুড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, আর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্ম গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বগুড়া শুরু থেকেই প্রতিরোধে নামে। মার্চের শেষ দিকে ছাত্র-জনতা পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করে। এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী শহরে ঢুকে নানা জায়গায় হত্যাযজ্ঞ চালায়; ধুনট, নন্দীগ্রাম ও শহরের আশপাশে একাধিক বধ্যভূমি ও গণকবর পরে শনাক্ত হয়েছে। বগুড়া সেনানিবাসের বিজয়াঙ্গন জাদুঘর এখন সেই সময়ের স্মৃতি ধরে রেখেছে।

করতোয়া, যমুনা আর আলুর মাঠ

বগুড়ার পূর্ব দিক দিয়ে বয়ে গেছে বিশাল যমুনা, সারিয়াকান্দি আর ধুনটের চরাঞ্চল সেই নদীর খেয়ালে প্রতি বছর বদলায়। জেলার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া করতোয়া এখন অনেকটা শীর্ণ, কিন্তু প্রাচীন কালে এই নদীই ছিল পুণ্ড্রনগরের প্রাণ। বাঙালি, নাগর ও ইছামতী নদীও জেলার কৃষিকে সেচ দেয়। পশ্চিমের দিকে মাটি কিছুটা উঁচু, বরেন্দ্র ভূমির ছোঁয়া পাওয়া যায়।

জেলার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। ধান তো আছেই, তার সঙ্গে আলু, মরিচ, ভুট্টা আর সবজিতে বগুড়ার নাম আছে, এসব পণ্য দেশের বাইরেও যায়। শহর হিসেবে বগুড়া উত্তরাঞ্চলের ব্যবসার বড় কেন্দ্র; কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির ছোট-বড় কারখানা এখানে গড়ে উঠেছে। শেরপুর আর কাহালুর গ্রামের নারীরা হাতের কাজ আর জালি তৈরি করেন, যা বিদেশেও রপ্তানি হয়।

লোকগান, বেহুলার গল্প আর মানুষ

বগুড়ার গ্রামে এখনো জারিগান, মারফতি, ভাটিয়ালি, কবিগান, কীর্তন আর যাত্রাপালার চল আছে। মেয়েলি গীত গাওয়া হয় বিয়ের আসরে। এই জেলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মনসামঙ্গলের বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি; মহাস্থানগড়ের কাছের গোকুল মেধকে স্থানীয়ভাবে বেহুলার বাসরঘর বলা হয়, যদিও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে এটি আসলে প্রাচীন একটি মন্দিরের ভিত্তি। মহাস্থানগড়ে হযরত শাহ সুলতান বলখী মাহিসাওয়ারের মাজারকে ঘিরে প্রতি বছর বহু মানুষের সমাগম হয়।

খেলার মাঠেও বগুড়ার পরিচিতি আছে। শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়েছে, আর জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম এই শহরেরই সন্তান।

যেখানে ঘুরে আসা যায়

  • মহাস্থানগড় ও প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর: শহর থেকে উত্তরে, প্রাচীন নগরের প্রাচীর, গোবিন্দ ভিটা ও শীলাদেবীর ঘাট এক যাত্রায় দেখা যায়।
  • গোকুল মেধ: মহাস্থানের কাছে উঁচু ইটের স্থাপনা, বেহুলার বাসরঘর নামে পরিচিত।
  • ভাসু বিহার: বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ, শান্ত গ্রামের মধ্যে।
  • খেরুয়া মসজিদ: শেরপুরে, মুঘল আমলের তিন গম্বুজের মসজিদ।
  • নবাব বাড়ি জাদুঘর ও বিজয়াঙ্গন: শহরের ভেতরের দুটি জাদুঘর।

বগুড়ার স্বাদ: সরা, কটকটি আর ভর্তা

বগুড়ার কথা উঠলে প্রথমেই আসে মিষ্টি দই। স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়, শেরপুরের ঘোষ পরিবারের হাতে প্রায় আড়াই শ বছর আগে এই দইয়ের শুরু; প্রথমে টক দই, পরে মানুষের রুচি বদলে মিষ্টি দই জনপ্রিয় হয়। দুধ আর চিনি দীর্ঘ সময় জ্বাল দিয়ে লালচে করে মাটির সরায় ঢেলে রাতভর বসিয়ে রাখা হয়, ভোরে সেটা জমে ওঠে। ২০২৩ সালে বগুড়ার দই ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পায়। শেরপুর আর সোনাতলার দই এখনো আলাদা করে খোঁজেন অনেকে।

মহাস্থানগড়ে গেলে ফেরার পথে কটকটি না কিনে কেউ ফেরেন না। চালের গুঁড়া দিয়ে বানানো, তেলে বা ঘিয়ে ভাজা এই শক্ত মিষ্টি খাবার মাজারের আশপাশের দোকানে ঢিবি করে সাজানো থাকে। শহরের হোটেলে কাচ্চি বিরিয়ানির কদর আছে, বিশেষ করে উৎসব আর বিয়ের মৌসুমে। আর আলুর দেশ বলে ঘরে ঘরে আলু ভর্তা প্রতিদিনের পাতের অংশ, সর্ষের তেল আর পোড়া শুকনা মরিচে মাখা। এসব খাবারের বিস্তারিত পাবেন বগুড়ার বিখ্যাত খাবার পাতায়।

কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন

ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত পথ সড়কপথ, যমুনা সেতু পার হয়ে উত্তরবঙ্গের মহাসড়ক ধরে। রেলপথেও যাওয়া যায়, উত্তরবঙ্গগামী কিছু ট্রেন বগুড়া হয়ে চলে। মহাস্থানগড় ঘোরার জন্য শীতকাল সবচেয়ে আরামদায়ক, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে। তখন দইয়ের স্বাদও যেন একটু বেশি জমে।

সাধারণ প্রশ্ন

বগুড়ার নাম কোথা থেকে এসেছে?

ত্রয়োদশ শতকে বাংলার শাসক নাসিরউদ্দিন বুগরা খানের নাম থেকে বগুড়া নামের উৎপত্তি বলে ধরা হয়। আগের ইংরেজি বানান ছিল বগরা।

মহাস্থানগড় কেন বিখ্যাত?

মহাস্থানগড়কে প্রাচীন পুণ্ড্রনগর হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর-ধ্বংসাবশেষগুলোর একটি। এখানে মৌর্য থেকে মুসলিম আমল পর্যন্ত নানা যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে।

বগুড়ার দই কোথায় সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়?

ঐতিহ্যগতভাবে শেরপুর উপজেলা বগুড়ার দইয়ের জন্মস্থান হিসেবে পরিচিত, সোনাতলার দইয়েরও সুনাম আছে। শহরের সাতমাথা এলাকায় বহু পুরোনো দইয়ের দোকান রয়েছে।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

বগুড়ার খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ বগুড়ার খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রাজশাহী বিভাগের অন্য জেলা