Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

চট্টগ্রাম জেলা: পাহাড়, সাগর আর মেজবানের দেশ

চট্টগ্রাম বিভাগ · ২৫টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. নামের পেছনে প্রদীপ, পাখি আর বদ্বীপ
  2. বন্দর থেকে শুরু হওয়া ইতিহাস
  3. একাত্তরের কালুরঘাট
  4. পাহাড়, নদী আর বন্দরের জীবিকা
  5. আউলিয়া, বলীখেলা আর মাইজভাণ্ডারী গান
  6. দেখার মতো কয়েকটি জায়গা
  7. মেজবানের ডেকচি থেকে শুঁটকির হাঁড়ি
  8. ঢাকা থেকে যাওয়া ও উপযুক্ত সময়
  9. সাধারণ প্রশ্ন

কোনো চট্টগ্রামবাসীকে নিজের জেলার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে উত্তরটা সম্ভবত শুরু হবে একটা দাওয়াতের কথা দিয়ে। বিশাল ডেকচিতে রাতভর রান্না হচ্ছে ঝাল গরুর মাংস, উঠোনে সারি সারি পাটি পাতা, ধনী-গরিব পাশাপাশি বসে খাচ্ছে। মেজবানের এই ছবিটাই হয়তো চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে সৎ পরিচয়: উদার, প্রাণখোলা আর ঝাঁঝালো। এর চারপাশে আছে পাহাড়, সাগর, কর্ণফুলী নদী আর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। হাজার বছর ধরে আরব বণিক, পর্তুগিজ নাবিক, আরাকানি রাজা আর মোগল সেনাপতিদের আনাগোনায় এই জেলার গল্প যেমন লম্বা, তেমনই রঙিন।

নামের পেছনে প্রদীপ, পাখি আর বদ্বীপ

চট্টগ্রামের মতো এত নাম বোধহয় দেশের আর কোনো জনপদের নেই। পুরোনো বইপত্রে চাটিগাঁও, চাটগাঁ, রম্যভূমি, ইসলামাবাদসহ কয়েক ডজন নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। নামের উৎস নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি আউলিয়াদের ঘিরে। প্রচলিত আছে, ইসলাম প্রচারে আসা সাধকেরা এক উঁচু টিলায় বিশাল প্রদীপ জ্বেলেছিলেন; স্থানীয় ভাষায় প্রদীপকে বলে "চাটি", আর সেখান থেকেই চাটিগাঁও। আরেক মত বলে, আরব নাবিকেরা গঙ্গার বদ্বীপ বোঝাতে যে শব্দ ব্যবহার করতেন, তা থেকে এসেছে এই নাম। উইলিয়াম জোন্সের মতো পণ্ডিত আবার স্থানীয় এক ছোট পাখির নামের সঙ্গে মিল খুঁজেছিলেন। মোগলরা জয়ের পর এর নাম দিয়েছিল ইসলামাবাদ, যদিও সেটি টেকেনি। স্থানীয় মানুষের মুখে আজও প্রিয় নাম "চাটগাঁ"।

বন্দর থেকে শুরু হওয়া ইতিহাস

চট্টগ্রামের ইতিহাস মূলত তার বন্দরের ইতিহাস। প্রাচীন কাল থেকেই এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল, আর নবম শতক থেকে আরব বণিকদের এখানে বাণিজ্যের তথ্য পাওয়া যায়। অনেক শতাব্দী অঞ্চলটি আরাকান রাজ্যের প্রভাবে ছিল। চতুর্দশ শতকে সোনারগাঁওয়ের সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ চট্টগ্রাম জয় করেন। ষোড়শ শতকে আবার আরাকানিদের হাতে যায়, আর সেই সময় পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের দাপটে উপকূলের মানুষ অতিষ্ঠ ছিল।

এই অস্থিরতার অবসান ঘটে ১৬৬৬ সালে, যখন বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খানের পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান পর্তুগিজ ও আরাকানিদের হটিয়ে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাপিডিয়া এই বছরকেই চট্টগ্রাম জেলার প্রতিষ্ঠাকাল হিসেবে উল্লেখ করে। ১৭৬০ সালে নবাব মীর কাসিম চট্টগ্রাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দেন। তখন পার্বত্য অঞ্চলও এই জেলার অংশ ছিল; ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম আলাদা করা হয়, আর পরে কক্সবাজারও আলাদা জেলা হয়।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের নাম চিরস্থায়ী হয়ে আছে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিলের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের জন্য। রাউজানের নোয়াপাড়ার মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন এর নেতা, আর পটিয়ার ধলঘাটের প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পরে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়ে প্রাণ দেন।

একাত্তরের কালুরঘাট

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে চট্টগ্রাম ছিল প্রতিরোধের কেন্দ্র। কর্ণফুলীর তীরে কালুরঘাটে চালু হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আর ২৭ মার্চ সেখান থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। পরে বেতার কেন্দ্রটি সরিয়ে নিতে হয়। যুদ্ধের নয় মাসে জেলার নানা স্থানে গণহত্যা হয়, অনেকগুলো গণকবর পরে চিহ্নিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর বন্দরের চ্যানেলে রেখে যাওয়া মাইন অপসারণ করতে বিদেশি নৌ-বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে হয়েছিল।

পাহাড়, নদী আর বন্দরের জীবিকা

চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতি দেশের অন্য জেলাগুলোর তুলনায় একেবারে আলাদা। উত্তরে মিরসরাই-সীতাকুণ্ডের পাহাড়, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, মাঝখান দিয়ে কর্ণফুলী, আর দক্ষিণে সাঙ্গু নদী। হালদা নদী আবার দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে পরিচিত, যেখানে রুই জাতীয় মাছ সরাসরি ডিম ছাড়ে এবং জেলেরা সেই ডিম সংগ্রহ করেন। সমুদ্রের মধ্যে আছে সন্দ্বীপের মতো দ্বীপ উপজেলা।

অর্থনীতির কেন্দ্রে চট্টগ্রাম বন্দর, যার মাধ্যমে দেশের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ সম্পন্ন হয়। দেশের প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলও এখানে। সীতাকুণ্ডের উপকূলে আছে জাহাজভাঙা শিল্প। শহরের বাইরে কৃষি এখনও বড় জীবিকা, আর প্রবাসী আয় বহু গ্রামের চেহারা বদলে দিয়েছে।

আউলিয়া, বলীখেলা আর মাইজভাণ্ডারী গান

চট্টগ্রামকে বলা হয় বারো আউলিয়ার দেশ। শাহ আমানত আর বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারে প্রতিদিন হাজারো মানুষ যায়; বায়েজিদের মাজারের পুকুরের বিশাল কাছিমগুলো দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। ফটিকছড়ির মাইজভাণ্ডার দরবার থেকে জন্ম নিয়েছে এক বিশেষ ধারার আধ্যাত্মিক গান। রাউজানের মহামুনি বৌদ্ধ মন্দির আর সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়চূড়ার মন্দির দেখায় জেলার ধর্মীয় বৈচিত্র্য।

বৈশাখ মাসের ১২ তারিখে লালদীঘির মাঠে বসে জব্বারের বলীখেলা। ১৯০৯ সালে ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর তরুণদের শরীরচর্চায় উৎসাহ দিতে এই কুস্তি প্রতিযোগিতা শুরু করেন। খেলাকে ঘিরে তিন দিনের বৈশাখী মেলায় মাটির হাঁড়ি থেকে বেতের মোড়া, সবই পাওয়া যায়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান আর এর নিজস্ব ভাষার টানও এই জেলার আলাদা পরিচয়। পুঁথি সংগ্রাহক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ পটিয়ার সন্তান।

দেখার মতো কয়েকটি জায়গা

পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে কর্ণফুলী যেখানে সাগরে মিশেছে, সেখানে বসে বড় বড় জাহাজের নোঙর দেখা যায়। ফয়েস লেক পাহাড়ঘেরা একটি পুরোনো কৃত্রিম হ্রদ। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার পথ পরিশ্রমের হলেও চূড়া থেকে সাগর আর পাহাড়ের দৃশ্য অনেক দিন মনে থাকে। মিরসরাইয়ের পাহাড়ি ঝরনা আর রাঙ্গুনিয়ার দিকে কর্ণফুলীর তীরও ভ্রমণপ্রিয়দের পছন্দ। শহরের ভেতরে জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর ঘুরলে দেশের নানা জাতিগোষ্ঠীর জীবনের একটা ধারণা পাওয়া যায়।

মেজবানের ডেকচি থেকে শুঁটকির হাঁড়ি

চট্টগ্রামের খাবার মানেই ঝাল, মশলা আর উদারতা। মেজবানি মাংস রান্না হয় বিশেষ মশলার মিশ্রণে; গরুর মাংসের সঙ্গে চর্বি আর হাড় মিলে ঝোলটা হয় লালচে আর ঘন। মেজবানে এর সঙ্গে থাকে নলা দিয়ে রাঁধা পাতলা ডাল, যাকে অনেকে নলা কাঞ্জি বলেন। কালা ভুনা আরেক গর্বের পদ: মাংস দীর্ঘক্ষণ মশলায় ভুনতে ভুনতে প্রায় কালচে রং ধরে, আর স্বাদটা হয় গাঢ় ও ঝাঁঝালো।

সাগরের কাছের জেলা বলে শুঁটকি এখানকার রান্নাঘরের নিয়মিত সদস্য। লইট্টা, ছুরি বা চিংড়ি শুঁটকি পেঁয়াজ-রসুন আর প্রচুর মরিচ দিয়ে ভুনা করা হয়, গরম ভাতের সঙ্গে যার তুলনা নেই। বিয়ে বা উৎসবে চাল আর মাংস একসঙ্গে রেঁধে আখনি বানানোর চলও আছে, যা বিরিয়ানির চেয়ে হালকা কিন্তু সুগন্ধে ভরপুর। শহরের কোন দোকানে কোন পদ ভালো, তা খুঁজে পাবেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

ঢাকা থেকে যাওয়া ও উপযুক্ত সময়

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার তিনটি পথই জনপ্রিয়: মহাসড়ক ধরে বাস, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে আন্তনগর ট্রেন, আর শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে আকাশপথ। শীতকাল, মোটামুটি নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, ঘোরার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। তবে ঝরনা দেখতে চাইলে বর্ষার শেষভাগ ভালো, আর বলীখেলা দেখতে হলে বৈশাখের মাঝামাঝি যেতে হবে।

সাধারণ প্রশ্ন

মেজবান কী?

মেজবান চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী গণভোজ, যেখানে বিশেষ মশলায় রাঁধা ঝাল গরুর মাংস, সাদা ভাত আর নলার ডাল পরিবেশন করা হয়। জন্ম, মৃত্যুবার্ষিকী বা নানা উপলক্ষে এর আয়োজন হয়।

জব্বারের বলীখেলা কবে হয়?

প্রতি বছর বৈশাখের ১২ তারিখে চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘি মাঠে এই কুস্তি প্রতিযোগিতা হয়। সঙ্গে বসে কয়েক দিনের বৈশাখী মেলা।

চট্টগ্রামকে বারো আউলিয়ার দেশ বলা হয় কেন?

প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বারোজন সুফি সাধক এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। শাহ আমানত, বায়েজিদ বোস্তামীসহ নানা মাজার এই ঐতিহ্যের চিহ্ন বহন করে।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

চট্টগ্রামের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ চট্টগ্রামের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 চট্টগ্রাম বিভাগের অন্য জেলা