Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

ঢাকা জেলা: বুড়িগঙ্গার তীরে চার শতকের রাজধানী

ঢাকা বিভাগ · ৪৬টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. ঢাকা নামটি কোথা থেকে এল
  2. সুলতানি জনপদ থেকে জাহাঙ্গীরনগর
  3. একাত্তরের ঢাকা
  4. নদীঘেরা জেলা, ব্যস্ত অর্থনীতি
  5. পুরান ঢাকার উৎসব আর কারিগরি
  6. যেখানে যেতে হবে
  7. ঢাকার খাবার: বাকরখানি থেকে কাচ্চি
  8. যাতায়াত ও ভ্রমণের সময়
  9. সাধারণ প্রশ্ন

ভোরে সদরঘাটে দাঁড়ালে বুড়িগঙ্গার ঘোলা জলে লঞ্চের ভেঁপু, মাঝির ডাক আর কুলিদের হাঁকডাক একসঙ্গে কানে আসে। এই নদীর তীরেই একদিন গড়ে উঠেছিল মুঘল সুবা বাংলার রাজধানী, আর আজ সেই শহর দেশের রাজধানী। ঢাকা জেলা শুধু রাজধানী শহর নয়; এর মধ্যে আছে সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ আর দোহারের মতো গ্রামপ্রধান উপজেলাও, যেখানে এখনো ধানখেত, কাঁসার কারিগর আর পদ্মার চর দেখা যায়। ইতিহাস, ব্যবসা, রাজনীতি আর খাবার, সবকিছুর কেন্দ্র হয়ে থাকা এই জেলাকে বুঝতে হলে পুরান ঢাকার গলি থেকে শুরু করাই ভালো।

ঢাকা নামটি কোথা থেকে এল

ঢাকা নামের উৎস নিয়ে নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই, আছে কয়েকটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা। প্রচলিত আছে, একসময় এই অঞ্চলে প্রচুর ঢাক গাছ জন্মাত, সেখান থেকেই নাম হয়েছে ঢাকা। আরেকটি মত বলে, শহরের পুরোনো অংশে অবস্থিত ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দেবীর নাম থেকে জায়গার নাম এসেছে। তৃতীয় একটি গল্পও লোকমুখে ঘোরে: সুবাদার ইসলাম খান যখন এখানে রাজধানী স্থাপন করেন, তখন উৎসবে ঢাক বাজানো হয়েছিল, আর সেই ঢাকের শব্দ থেকেই নাম। কেউ কেউ প্রাচীন সাহিত্যে উল্লিখিত ‘ঢাক্কা’ শব্দের সঙ্গেও মিল খোঁজেন। এর কোনোটিই প্রমাণিত ইতিহাস নয়, তবে প্রতিটি গল্পই শহরটির বহুস্তরী অতীতের একটা আভাস দেয়।

সুলতানি জনপদ থেকে জাহাঙ্গীরনগর

মুঘলদের আসার আগেও ঢাকা একেবারে অচেনা জায়গা ছিল না। পুরোনো শহরে পাওয়া পঞ্চদশ শতকের মসজিদের শিলালিপি বলে, সুলতানি আমলেই এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল। তবে ঢাকার ভাগ্য বদলায় ১৬১০ সালে, যখন সুবাদার ইসলাম খান চিশতি রাজমহল থেকে সুবা বাংলার রাজধানী এখানে সরিয়ে আনেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে শহরের নাম রাখেন জাহাঙ্গীরনগর। সরকারি কাগজে নতুন নাম চললেও সাধারণ মানুষ আর বিদেশি বণিকেরা পুরোনো নামেই শহরটিকে ডাকত।

মুঘল আমলে বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠে কাটরা, মসজিদ, বাজার আর বাগান। ১৬৭৮ সালের দিকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা আজম লালবাগে একটি দুর্গের কাজ শুরু করেন, যা শেষ পর্যন্ত অসমাপ্তই থেকে যায়। অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় প্রাদেশিক রাজধানী মুর্শিদাবাদে চলে গেলে ঢাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে আসে, যদিও এখানে নায়েব নাজিমের দপ্তর থেকে যায়। এই শহরের তাঁতিদের হাতে বোনা মসলিন তখন দূরদেশের বাজারেও দামি পণ্য, কিন্তু ব্রিটিশ আমলে বিলেতি সস্তা কাপড়ের চাপে সেই শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।

ব্রিটিশ শাসনে ঢাকা বিভাগীয় সদর হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ঢেউ লালবাগেও এসে পৌঁছেছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকা নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী হয়, যদিও ১৯১১ সালে সেই বিভাজন বাতিল হয়ে যায়। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরের দশকগুলোতে এ অঞ্চলের রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের পর ঢাকা পূর্ববঙ্গ, পরে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হয়, আর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত দিনগুলোও এই শহরেরই স্মৃতি।

একাত্তরের ঢাকা

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঢাকার নাম জড়িয়ে আছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় প্রথম বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পিলখানা, রাজারবাগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস ও শিক্ষকদের আবাসে হামলা চালায়; সেই রাতেই ধানমন্ডির বাসা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। যুদ্ধের নয় মাসে শহরের ভেতরে গেরিলারা একের পর এক অভিযান চালান। বিজয়ের ঠিক আগে, ১৪ ডিসেম্বর, বহু বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। আর ১৬ ডিসেম্বর রমনা রেসকোর্সে, আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ সেই আত্মত্যাগের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নদীঘেরা জেলা, ব্যস্ত অর্থনীতি

ঢাকা জেলাকে ঘিরে রেখেছে কয়েকটি নদী: দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, পশ্চিমে তুরাগ, আর জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে ধলেশ্বরী, ইছামতী ও পদ্মা। দোহার আর নবাবগঞ্জের দিকে গেলে পদ্মার চর আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ চোখে পড়ে, যা মূল শহরের কংক্রিটের সঙ্গে একেবারে বিপরীত ছবি। মহানগরের অর্থনীতি চলে ব্যবসা, সেবা, পোশাক কারখানা, সরকারি দপ্তর আর অসংখ্য ছোট কারখানার ওপর; অন্যদিকে গ্রামীণ উপজেলাগুলোতে এখনো কৃষি বড় ভরসা। দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এই জেলায় প্রায় সারা দেশের মানুষই কোনো না কোনো সময় জীবিকার খোঁজে এসেছে।

পুরান ঢাকার উৎসব আর কারিগরি

ঢাকার নিজস্ব সংস্কৃতির সবচেয়ে রঙিন অংশ পুরান ঢাকা। পৌষের শেষ দিনে সাকরাইনে ছাদে ছাদে ঘুড়ি ওড়ে, সন্ধ্যায় আতশবাজি আর আগুনের খেলা চলে। মহররমে হোসেনি দালান থেকে তাজিয়া মিছিল বের হয়, ঈদে চকবাজারের রাস্তা জমে ওঠে। শাঁখারীবাজারে এখনো শাঁখা কাটার কারিগরেরা বসেন, আর মিরপুরের বেনারসি পল্লিতে তাঁতের খটখট শব্দ শোনা যায়। জেলার পশ্চিমে ধামরাইয়ের কাঁসা-পিতলের কারিগরি আর আষাঢ়ে জগন্নাথের রথযাত্রা বহু পুরোনো ঐতিহ্য।

শহরের আধুনিক সাংস্কৃতিক জীবনও কম বৈচিত্র্যময় নয়। ফেব্রুয়ারিজুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা, পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে গান আর চারুকলা থেকে বের হওয়া শোভাযাত্রা এখন ঢাকার পরিচয়ের অংশ।

যেখানে যেতে হবে

  • লালবাগ কেল্লা: অসমাপ্ত মুঘল দুর্গ, ভেতরে পরী বিবির সমাধি।
  • আহসান মঞ্জিল: বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকার নবাবদের গোলাপি প্রাসাদ, এখন জাদুঘর।
  • তারা মসজিদ ও ঢাকেশ্বরী মন্দির: পুরান ঢাকার দুই পরিচিত উপাসনালয়।
  • জাতীয় সংসদ ভবন: স্থপতি লুই কানের নকশায় গড়া শেরেবাংলা নগরের স্থাপত্য।
  • জাতীয় স্মৃতিসৌধ, সাভার: মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে নির্মিত।

ঢাকার খাবার: বাকরখানি থেকে কাচ্চি

ঢাকার খাবারের গল্পে মুঘল রান্নাঘরের ছাপ স্পষ্ট। পুরান ঢাকার বিয়েবাড়ি বা উৎসবে খাসির মাংস আর আলু দিয়ে দমে রান্না করা কাচ্চি বিরিয়ানি না থাকলে আয়োজন যেন অসম্পূর্ণ। এর পাশে থাকে মোরগ পোলাও, ঘি আর মসলায় রাঁধা মুরগির সঙ্গে সুগন্ধি চালের এক ধরনের ভোজ। ভারী খাবারের পর হজমের জন্য আসে বোরহানি, দই, পুদিনা আর মসলায় তৈরি ঝাঁঝালো পানীয়।

সকালের চায়ের সঙ্গে পুরান ঢাকার মানুষের পছন্দ বাকরখানি, তন্দুরে সেঁকা মচমচে স্তরের রুটি। প্রচলিত আছে, আগা বাকের নামের এক অভিজাত ব্যক্তি ও খনি বেগমের প্রেমের গল্প থেকে এর নাম এসেছে, যদিও এটি জনশ্রুতি। রমজানে চকবাজারের ইফতার বাজারে ভিড় জমে হালিম, কাবাব আর নানা পদের জন্য। বিকেলের দিকে শহরের যেকোনো মোড়ে ফুচকার দোকান ঘিরে মানুষের জটলা চোখে পড়ে; টক জল আর মসলাদার আলুর পুর ভরা এই ছোট খাবারটি ঢাকার রাস্তার সংস্কৃতির অংশ। কোন খাবার কোথায় ভালো পাওয়া যায়, তার খোঁজ পাবেন ঢাকার বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাতায়াত ও ভ্রমণের সময়

ঢাকা দেশের যোগাযোগব্যবস্থার কেন্দ্র। দেশের সব প্রান্ত থেকে সড়কপথে বাস আসে, কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশন হয়ে রেলপথে যুক্ত বেশির ভাগ জেলা, দক্ষিণাঞ্চল থেকে লঞ্চে আসা যায় সদরঘাটে, আর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশ-বিদেশের ফ্লাইট ওঠানামা করে। শহর ঘোরার জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শীতকাল সবচেয়ে আরামদায়ক; এ সময়ে বইমেলা, সাকরাইন আর শীতের পিঠার দোকানও পাওয়া যায়।

সাধারণ প্রশ্ন

ঢাকা কবে বাংলার রাজধানী হয়?

১৬১০ সালে সুবাদার ইসলাম খান চিশতি রাজমহল থেকে সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায় আনেন। তখন শহরের নাম রাখা হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর।

ঢাকার কোন খাবার সবচেয়ে বিখ্যাত?

পুরান ঢাকার কাচ্চি বিরিয়ানি, মোরগ পোলাও আর বাকরখানি সবচেয়ে পরিচিত। সঙ্গে বোরহানি, রমজানের হালিম আর রাস্তার ফুচকাও ঢাকার পরিচয় বহন করে।

পুরান ঢাকায় একদিনে কী কী দেখা যায়?

সকালে লালবাগ কেল্লা দেখে আহসান মঞ্জিল, তারা মসজিদ ও ঢাকেশ্বরী মন্দির ঘোরা যায়। বিকেলে সদরঘাটে নদীর দৃশ্য দেখে চকবাজার বা নাজিমুদ্দিন রোডে খাবার চেখে দিন শেষ করা যায়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

ঢাকার খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ ঢাকার খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 ঢাকা বিভাগের অন্য জেলা