Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

ফরিদপুর জেলা: পদ্মা, পাট আর পল্লিকবির দেশ

ঢাকা বিভাগ · ৯টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. ফতেহাবাদ থেকে ফরিদপুর
  2. ব্রিটিশ আমল ও মুক্তিযুদ্ধ
  3. পদ্মা, কুমার আর মধুমতির জল
  4. কবিতা, আশ্রম আর মেলা
  5. ফরিদপুরে যা দেখার আছে
  6. খাবারের টেবিলে নদী আর খেজুর গাছ
  7. যাওয়ার পথ ও ভালো সময়
  8. সাধারণ প্রশ্ন

গ্রামবাংলার মাঠ, নকশিকাঁথা আর সাধারণ মানুষের কথা যিনি কবিতায় অমর করে গেছেন, সেই পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের গ্রামের পাশ দিয়ে আজও ধীরে বয়ে যায় কুমার নদ। ফরিদপুর জেলা এমনই এক জনপদ, যেখানে মধ্যযুগের সুলতানদের টাকশাল, সুফি সাধকের নাম, পদ্মার ভাঙন আর গ্রামবাংলার কবিতা একসঙ্গে মিশে আছে। ঢাকা বিভাগের এই জেলা পাট আর পেঁয়াজ চাষের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত, আবার শীতের সকালে খেজুরের রস আর পদ্মার ইলিশের স্বাদও এখানকার মানুষের গর্বের বিষয়।

ফতেহাবাদ থেকে ফরিদপুর

আজকের ফরিদপুর শহরের পুরোনো নাম ছিল ফতেহাবাদ। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের আমলে, পঞ্চদশ শতকের গোড়া থেকে, ফতেহাবাদ ছিল একটি টাকশাল শহর; এখানে মুদ্রা তৈরি হতো, যা থেকে বোঝা যায় জায়গাটি তখন প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ষোড়শ শতকের বাংলা সাহিত্যেও ফতেহাবাদের নাম পাওয়া যায়।

পরবর্তীকালে শহরের নাম বদলে হয় ফরিদপুর। প্রচলিত আছে, আজমিরের খাজা মইনুদ্দিন চিশতির শিষ্য সুফি সাধক শাহ ফরিদউদ্দিন মাসউদ এখানে আস্তানা গেড়েছিলেন, আর তাঁর নামেই শহরের নতুন নাম। নাম বদলের সঠিক সময় নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন কথা পাওয়া যায়, তবে সাধকের নামের সঙ্গে শহরের সংযোগ নিয়ে স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস দৃঢ়।

ব্রিটিশ আমল ও মুক্তিযুদ্ধ

ব্রিটিশ শাসনে এই অঞ্চল প্রথমে ঢাকার প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল। পরে ১৮১৫ সালে আলাদা জেলা হিসেবে ফরিদপুরের যাত্রা শুরু হয়, আর ১৮৬৯ সালে গঠিত হয় ফরিদপুর পৌরসভা। একসময়ের বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার ভেতরেই ছিল আজকের গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর আর রাজবাড়ী; ১৯৮৪ সালে এগুলো আলাদা জেলা হলে বর্তমান ফরিদপুর জেলার রূপ দাঁড়ায়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর কঠিন সময় পার করেছে। শহরের শ্রীঅঙ্গনে প্রভু জগদ্বন্ধুর আশ্রমে পাকিস্তানি সেনারা আটজন ব্রহ্মচারীকে হত্যা করে আশ্রমে আগুন দেয়। ভাঙ্গা উপজেলায় এপ্রিল-মে মাসে কয়েকটি গ্রামে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ঘটে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধারা নগরকান্দায় পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণ করে অস্ত্র সংগ্রহ করেন, আর ডিসেম্বরে করিমপুর সেতুর কাছে বড় একটি সংঘর্ষ হয়। জেলার বিভিন্ন জায়গায় গণকবর ও বধ্যভূমি সেই সময়ের সাক্ষী।

পদ্মা, কুমার আর মধুমতির জল

ফরিদপুরের উত্তর-পূর্ব সীমানা ঘেঁষে বয়ে গেছে পদ্মা, ভেতর দিয়ে গেছে পুরোনো কুমার নদ, আড়িয়াল খাঁ আর জেলার পশ্চিম সীমানায় মধুমতি ও গড়াইয়ের ধারা। বর্ষায় নদীর পানি বাড়লে চরের মানুষের জীবন বদলে যায়, আবার পানি নামলে সেই পলিমাটিতেই ফলে সোনালি ফসল। জেলায় ধোলসমুদ্র, শকুনের বিলসহ কয়েকটি বড় জলাশয়ও আছে।

এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। ফরিদপুর দেশের অন্যতম বড় পাট উৎপাদনকারী অঞ্চল; বর্ষার শেষে রাস্তার ধারে, পুকুরে পাট জাগ দেওয়ার দৃশ্য খুব চেনা। পেঁয়াজ চাষেও জেলাটি সামনের সারিতে, বিশেষ করে শীতের শেষে মাঠজুড়ে পেঁয়াজের সবুজ সারি দেখা যায়। এর পাশাপাশি ধান, গম, ডাল, তেলবীজ আর মসলার চাষ হয়, আর শীতে খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করেন গাছিরা।

ফরিদপুর শহরের গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া কুমার নদ একসময় ছিল এ অঞ্চলের ব্যবসার প্রধান পথ। পাটের মৌসুমে নৌকাভর্তি পাট আসত শহরের ঘাটে, সেখান থেকে যেত বড় নদীবন্দরে। সড়ক যোগাযোগ বাড়ার পর নদীর সেই ব্যস্ততা কমেছে, কিন্তু নদীপাড়ের গ্রামগুলোতে এখনো ডিঙি নৌকায় মাছ ধরা আর বর্ষায় পাট জাগ দেওয়ার দৃশ্য চেনা। পদ্মা সেতু চালুর পর জেলার ভাঙ্গা উপজেলা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সড়কপথের একটি বড় সংযোগস্থল হয়ে উঠেছে; এখান থেকে বরিশাল, খুলনা আর গোপালগঞ্জের দিকে পথ ভাগ হয়ে গেছে। ফলে কৃষিপণ্য, বিশেষ করে পেঁয়াজ আর পাট, এখন আগের চেয়ে অনেক দ্রুত রাজধানীর বাজারে পৌঁছায়।

কবিতা, আশ্রম আর মেলা

ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে আছেন পল্লিকবি জসীমউদ্দীন। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ বা ‘কবর’-এর মতো লেখায় তিনি গ্রামবাংলার মানুষের সুখ-দুঃখ যে ভাষায় তুলে ধরেছেন, তার শিকড় এই জেলার মাটিতেই। সদর উপজেলার অম্বিকাপুরে, কুমার নদের তীরে তাঁর পৈতৃক বাড়ি এখন দর্শনার্থীদের কাছে প্রিয় জায়গা। প্রতিবছর শীতের শেষে সেখানে বসে জসীম পল্লীমেলা; কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই মেলায় লোকগান, কারুপণ্য আর গ্রামীণ খাবারের দোকান বসে।

শিক্ষাবিদ ও লেখক হুমায়ুন কবিরও ফরিদপুরের সন্তান। আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের দিক থেকে শ্রীঅঙ্গনের জগদ্বন্ধু আশ্রম অনেক ভক্তের কাছে তীর্থস্থান। জেলার গ্রামে গ্রামে এখনো জারি, সারি আর বিচারগানের আসর বসে, আর নৌকাবাইচ বর্ষার পুরোনো আনন্দ।

ফরিদপুরে যা দেখার আছে

ভাঙ্গা উপজেলার পাথরাইল মসজিদ, যা মজলিশ আউলিয়া মসজিদ নামেও পরিচিত, সুলতানি আমলের স্থাপত্যের এক সুন্দর নিদর্শন; এর পাশে আছে পুরোনো দিঘি। মধুখালী উপজেলার মথুরাপুর দেউল টেরাকোটা অলংকরণে সাজানো উঁচু একটি স্থাপনা, যার নির্মাণকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে, তবে এটি কয়েকশ বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হয়। এ ছাড়া আছে শ্রীঅঙ্গনের জগদ্বন্ধু আশ্রম, অম্বিকাপুরে জসীমউদ্দীনের বাড়ি এবং কানাইপুরের শিকদার বাড়ির মতো পুরোনো জমিদারবাড়ি। পদ্মার পাড়ে বিকেলে দাঁড়ালে নদীর বিশালতা আলাদা করে মন কাড়ে।

খাবারের টেবিলে নদী আর খেজুর গাছ

নদীঘেরা জেলায় মাছ রান্নাঘরের প্রধান উপকরণ, আর বর্ষায় সেই মাছের রাজা পদ্মার ইলিশ। সরষের তেলে হালকা মসলায় ভাজা ইলিশ, সঙ্গে গরম ভাত আর ভাজার তেল, ফরিদপুরের অনেক বাড়িতে মৌসুমের প্রিয় খাবার। ইলিশের মাথা দিয়ে কচুশাক বা লাউয়ের তরকারিও রান্না হয়।

শীত এলে দৃশ্য বদলে যায়। ভোরে গাছিরা হাঁড়ি নামিয়ে আনেন, তাজা রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় খেজুরের গুড়, ঝোলা গুড় আর পাটালি। সেই গুড় দিয়েই বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয় পিঠার মৌসুম: চিতই পিঠা ঝোলা গুড়ে ডুবিয়ে খাওয়া, ভাপা পিঠার ভেতর গুড় আর নারকেলের পুর, আর রসে ভেজানো দুধ পিঠা। জসীম পল্লীমেলায় এই পিঠার দোকানগুলোর সামনেই সবচেয়ে বেশি ভিড় জমে। এলাকাভিত্তিক খাবারের বিস্তারিত খোঁজ পাবেন ফরিদপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাওয়ার পথ ও ভালো সময়

ঢাকা থেকে ফরিদপুর যেতে এখন বেশির ভাগ মানুষ সড়কপথে পদ্মা সেতু হয়ে ভাঙ্গা দিয়ে যান; পুরোনো পথ হিসেবে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি পার হয়েও যাওয়া যায়। পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ চালু হওয়ায় ভাঙ্গা পর্যন্ত রেলপথও এখন বিকল্প। ঘোরার জন্য ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে ভালো সময়; তখন খেজুরের রস, পিঠা আর পল্লীমেলা একসঙ্গে পাওয়া যায়। ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে বর্ষার মাসগুলো বেছে নিতে পারেন।

সাধারণ প্রশ্ন

ফরিদপুরের পুরোনো নাম কী ছিল?

ফরিদপুরের পুরোনো নাম ছিল ফতেহাবাদ, যা সুলতানি আমলে একটি টাকশাল শহর ছিল। পরে সুফি সাধক শাহ ফরিদের নামে শহরের নাম ফরিদপুর হয় বলে প্রচলিত আছে।

জসীমউদ্দীনের বাড়ি ফরিদপুরের কোথায়?

পল্লিকবির পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর এলাকায়, কুমার নদের তীরে। সেখানে প্রতিবছর জসীম পল্লীমেলা হয়।

ফরিদপুরে কোন খাবার খেতে হবে?

বর্ষায় পদ্মার ইলিশ ভাজা আর শীতে খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি নানা রকম পিঠা ফরিদপুরের সবচেয়ে পরিচিত স্বাদ।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

ফরিদপুরের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ ফরিদপুরের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 ঢাকা বিভাগের অন্য জেলা