Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

গোপালগঞ্জ জেলা: মধুমতি, বিল আর প্রাচীন বঙ্গের জনপদ

ঢাকা বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. নামের পেছনের গল্প
  2. কোটালীপাড়া: প্রাচীন বঙ্গের রাজধানী
  3. ব্রিটিশ আমল থেকে জেলা
  4. একাত্তরের দিনগুলো
  5. বিল আর নদীর দেশ
  6. মতুয়া তীর্থ, সুকান্ত মেলা আর গ্রামীণ সংস্কৃতি
  7. গোপালগঞ্জে কী দেখবেন
  8. বিলের মাছ, খেজুরের গুড় আর পিঠা
  9. যাতায়াত ও উপযুক্ত সময়
  10. সাধারণ প্রশ্ন

ষষ্ঠ শতকের কোনো এক সময় রাজার দপ্তরে তামার পাতে খোদাই করা হয়েছিল জমি হস্তান্তরের দলিল। প্রায় দেড় হাজার বছর পরে সেই তাম্রশাসন উঠে এসেছে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার মাটি থেকে, আর তার সূত্রে জানা গেছে এমন কয়েকজন রাজার নাম, যাঁদের কথা অন্য কোথাও প্রায় পাওয়াই যায় না। গোপালগঞ্জ জেলা তাই কেবল মধুমতির তীরের নিচু বিলের দেশ নয়, প্রাচীন বঙ্গের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঠিকানাও। ঢাকা বিভাগের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের এই জেলায় একসঙ্গে মিশে আছে মতুয়া তীর্থ, কবি সুকান্তের পৈতৃক ভিটা আর বর্ষার জলে ডুবে থাকা বিস্তীর্ণ ধানখেত।

নামের পেছনের গল্প

গোপালগঞ্জ নামের উৎস নিয়ে যে গল্পটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা এক জমিদার পরিবারকে ঘিরে। প্রচলিত আছে, জমিদার রানি রাসমণির এক নাতির নাম ছিল গোপাল, আর তাঁর নামের সঙ্গে বাজার বা গঞ্জ শব্দটি জুড়ে জায়গাটির নাম হয় গোপালগঞ্জ। কোনো কোনো সূত্রে বলা হয়, এর আগে এলাকাটি রাজগঞ্জ নামেও পরিচিত ছিল। এসব তথ্যের কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায় না, তাই একে লোকশ্রুতি হিসেবেই ধরা ভালো।

কোটালীপাড়া: প্রাচীন বঙ্গের রাজধানী

গোপালগঞ্জের ইতিহাসের সবচেয়ে পুরোনো অধ্যায় লুকিয়ে আছে কোটালীপাড়ায়। ঘাঘর নদের তীরের এই জনপদ থেকে পাওয়া কয়েকটি তাম্রশাসনে গুপ্ত-পরবর্তী যুগের তিন স্বাধীন রাজার নাম পাওয়া যায়: গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব। গবেষকদের মতে, ষষ্ঠ শতকে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গে যে স্বাধীন রাজ্য গড়ে উঠেছিল, কোটালীপাড়া ছিল তার একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র। একটি তাম্রশাসনে এ জায়গাকে চন্দ্রবর্মণকোট নামে উল্লেখ করা হয়েছে, আর এখনো স্থানীয়ভাবে একটি পুরোনো মাটির দুর্গের ধ্বংসাবশেষ সেই নামে পরিচিত।

ব্রিটিশ আমল থেকে জেলা

ব্রিটিশ আমলে গোপালগঞ্জ ছিল বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের সময় এটি আলাদা জেলার মর্যাদা পায়। জেলার পাঁচটি উপজেলা হলো গোপালগঞ্জ সদর, কোটালীপাড়া, মুকসুদপুর, কাশিয়ানী ও টুঙ্গিপাড়া।

টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৫ সালে নিহত হওয়ার পর তাঁকে টুঙ্গিপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়, যা এখন একটি সমাধি কমপ্লেক্স।

একাত্তরের দিনগুলো

মুক্তিযুদ্ধের সময় গোপালগঞ্জের নানা প্রান্তে রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে। এপ্রিলে সদরে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ হন। মে মাসে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবের পৈতৃক বাড়িতে হামলা চালিয়ে আশপাশের ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কোটালীপাড়ার কলাবাড়ী এলাকায় মে ও অক্টোবর মাসে দুই দফায় বহু গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে আগস্টে মুকসুদপুরে মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আক্রমণে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের বড় ক্ষতি হয়। জেলার বধ্যভূমি আর স্মৃতিস্তম্ভগুলো সেই সময়ের কথা ধরে রেখেছে।

বিল আর নদীর দেশ

গোপালগঞ্জের পশ্চিম সীমানা ধরে বয়ে গেছে মধুমতি নদী, আর জেলার ভেতর দিয়ে গেছে ঘাঘর, পুরোনো কুমার ও আরও কিছু ছোট নদী ও খাল। জেলার বড় অংশ নিচু জলাভূমি; বর্ষায় বিলগুলো পানিতে ভরে গেলে মাঠ আর জলের সীমানা মুছে যায়, যাতায়াত চলে নৌকায়। পানি নেমে গেলে সেই পলিমাটিতে বোরো ধানের সবুজ ঢেউ ওঠে। ধান, পাট, আখ আর বাদাম এখানকার প্রধান ফসল, আর বিলের মাছ ধরা বহু পরিবারের জীবিকার বড় অংশ। শীতে খেজুর গাছ কাটার মৌসুমও গ্রামের অর্থনীতিতে বাড়তি আয় আনে।

বর্ষায় বিলপাড়ের গ্রামগুলোর জীবন অন্য রকম হয়ে যায়। বাড়িগুলো তৈরি হয় উঁচু ভিটার ওপর, যাতে পানি উঠলেও ঘর শুকনো থাকে। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, স্কুল কিংবা হাটে যেতে ভরসা ডিঙি বা কলার ভেলা। বিলের জলে তখন ফোটে শাপলা, যার ডাঁটা দিয়ে গ্রামের মানুষ তরকারিও রাঁধেন। জেলেরা চাঁই আর জাল পেতে মাছ ধরেন, শিশুরা বড়শি হাতে বসে থাকে ঘাটে। পানি নামার পর শুরু হয় নতুন ব্যস্ততা: জমি তৈরি, বীজতলা আর বোরো ধান রোপণ। প্রকৃতির এই ওঠানামার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলাই গোপালগঞ্জের গ্রামীণ জীবনের বৈশিষ্ট্য।

মতুয়া তীর্থ, সুকান্ত মেলা আর গ্রামীণ সংস্কৃতি

বাংলাদেশের জেলাগুলোর মধ্যে গোপালগঞ্জে হিন্দু জনগোষ্ঠীর অনুপাত তুলনামূলক বেশি, আর তার একটি বড় পরিচয় মতুয়া সম্প্রদায়। কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি এই সম্প্রদায়ের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুরের সঙ্গে জড়িত, তাই এটি মতুয়া ভক্তদের প্রধান তীর্থ। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের নির্দিষ্ট তিথিতে এখানে বারুণী স্নান ও মেলা হয়; দেশ ও প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা লাখো ভক্তের ডঙ্কা-কাঁসির শব্দে তখন পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

কিশোর বিদ্রোহের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মেছিলেন কলকাতায়, তবে তাঁর পৈতৃক বাড়ি কোটালীপাড়ার উনশিয়া গ্রামে। তাঁর স্মরণে সেখানে নিয়মিত সুকান্ত মেলা হয়। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের জন্মও এই অঞ্চলে বলে জানা যায়। গ্রামের দিকে এখনো কীর্তন, পালাগান আর নৌকাবাইচের চল আছে।

গোপালগঞ্জে কী দেখবেন

টুঙ্গিপাড়ার সমাধি কমপ্লেক্স জেলার সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী টানা স্থান। কোটালীপাড়ায় চন্দ্রবর্মণকোট নামে পরিচিত পুরোনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষ আর সুকান্তের পৈতৃক ভিটা দেখা যায়। ওড়াকান্দির হরিমন্দির ও ঠাকুরবাড়ি মতুয়া সংস্কৃতি বুঝতে সাহায্য করে। এ ছাড়া সদর উপজেলার উলপুর জমিদারবাড়ি আর বর্ষায় বিলের নৌকাভ্রমণ এখানকার আলাদা অভিজ্ঞতা।

বিলের মাছ, খেজুরের গুড় আর পিঠা

বিলের দেশে রান্নার কেন্দ্রে থাকে মাছ। কই, শিং, মাগুর, শোল, টাকি আর পুঁটি, বর্ষা থেকে শীত পর্যন্ত এসব দেশি মাছ ধরা পড়ে খাল-বিলে, আর রান্না হয় হালকা মসলার মাছের ঝোলে। অনেক বাড়িতে কাঁচকলা, বেগুন বা আলু দিয়ে পাতলা ঝোল রান্না হয়, শেষে ছিটানো হয় ধনেপাতা। শীতে কই মাছের সঙ্গে ফুলকপি বা টাটকা শিমের তরকারিও প্রিয়।

শীতকাল এলে ভোরে গাছিরা খেজুরের রস নামান, দুপুরের মধ্যে উঠোনের চুলায় তা জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় দানাদার গুড় আর পাটালি। সেই গুড় দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হয় ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা আর দুধ চিতই। ওড়াকান্দির মেলা বা সুকান্ত মেলাতেও পিঠা-মুড়কির দোকান ঘিরে ভিড় থাকে। এলাকার খাবারের বিস্তারিত তালিকা দেখতে পারেন গোপালগঞ্জের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাতায়াত ও উপযুক্ত সময়

ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ সাধারণত সড়কপথে যাওয়া হয়; পদ্মা সেতু চালুর পর ভাঙ্গা হয়ে বাসে যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। জেলায় রেলপথও আছে, কাশিয়ানী হয়ে গোপালগঞ্জ পর্যন্ত লাইন গেছে। বিলের জলরাশি আর নৌকাভ্রমণ দেখতে চাইলে বর্ষার শেষভাগ ভালো, আর খেজুরের রস, পিঠা ও মেলার জন্য শীত থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত সময় সবচেয়ে উপযোগী।

সাধারণ প্রশ্ন

গোপালগঞ্জ কবে জেলা হয়?

ব্রিটিশ আমলে এটি ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল। ১৯৮৪ সালে গোপালগঞ্জ আলাদা জেলার মর্যাদা পায়।

ওড়াকান্দি কেন বিখ্যাত?

কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দি মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুরের সঙ্গে জড়িত তীর্থস্থান। ফাল্গুনে সেখানে বারুণী স্নান ও মেলায় লাখো ভক্ত আসেন।

গোপালগঞ্জের খাবারে বিশেষ কী আছে?

বিলের দেশি মাছের ঝোল আর শীতের খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পিঠা এই জেলার সবচেয়ে পরিচিত স্বাদ।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

গোপালগঞ্জের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ গোপালগঞ্জের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 ঢাকা বিভাগের অন্য জেলা