জামালপুর জেলা: দুই নদীর মাঝে সুই-সুতোর জনপদ
ময়মনসিংহ বিভাগ · ৭টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
শীতের সকালে জামালপুরের কোনো গ্রামের উঠানে গেলে দেখা যায়, রোদে পিঠ দিয়ে কয়েকজন নারী একটা কাঁথা কোলে নিয়ে বসে আছেন, সুইয়ের ফোঁড়ে ফুটে উঠছে লতা, পাখি, নৌকা আর মাছ। এই দৃশ্যটাই জামালপুরকে সবচেয়ে ভালো চেনায়। পশ্চিমে যমুনা, পূর্ব দিক দিয়ে বয়ে গেছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র; এই দুই নদীর পলিতে গড়া জামালপুর জেলা ময়মনসিংহ বিভাগের এক কৃষিনির্ভর, শান্ত অথচ ইতিহাসে ভারী জনপদ। এখানে একদিকে সুফি সাধকের দরগাহ, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম কঠিন রণাঙ্গন কামালপুর, আর মাঝখানে নকশিকাঁথা, কাঁসার বাসন ও গুড়ের হাট।
শাহ জামালের নামে এক শহর
জামালপুর নামের উৎস নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনিটি একজন সুফি সাধককে ঘিরে। প্রচলিত আছে, সম্রাট আকবরের শাসনামলে ইয়েমেন থেকে হযরত শাহ জামাল নামে এক ধর্মপ্রচারক অনুসারীদের নিয়ে এই অঞ্চলে আসেন এবং ব্রহ্মপুত্রের তীরে আস্তানা গাড়েন। তাঁর নাম থেকেই জায়গাটির নাম হয় জামালপুর। এর আগে এলাকাটি সিংহজানি নামে পরিচিত ছিল বলে জানা যায়; শহরের পুরোনো একটি স্কুলের নামেও সেই স্মৃতি টিকে আছে। শহরে শাহ জামালের মাজার আজও মানুষের ভিড়ে মুখর থাকে, আর দেওয়ানগঞ্জে আছে আরেক সাধক শাহ কামালের মাজার।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ থেকে আলাদা জেলা
দীর্ঘকাল জামালপুর ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার অংশ। ব্রিটিশ আমলে, ১৮৪৫ সালে এখানে মহকুমা গঠিত হয়। আঠারো শতকের শেষভাগে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ঢেউ এই অঞ্চলেও লেগেছিল, আর উনিশ শতকে নীলচাষবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে মাদারগঞ্জের নীলকুঠি। উনিশ শতকের একেবারে শেষ দিকে রেলপথ এলে জামালপুর হয়ে ওঠে উত্তর-মধ্যাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে জামালপুর আলাদা জেলার মর্যাদা পায়। পরে ১৯৮৪ সালে এর শেরপুর মহকুমা আলাদা জেলা হয়ে যায়।
কামালপুর: একাত্তরের কঠিন রণাঙ্গন
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জামালপুরের নাম উচ্চারিত হয় বকশীগঞ্জের কামালপুর সীমান্ত ঘাঁটির কারণে। পাকিস্তানি বাহিনীর এই সুরক্ষিত ঘাঁটি দখলের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা বারবার আক্রমণ চালান। জুলাইয়ের শেষ দিনের লড়াইয়ে ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজসহ বহু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। নভেম্বরে আরেক লড়াইয়ে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের গুরুতর আহত হন। শেষে টানা অবরোধের মুখে ৪ ডিসেম্বর ঘাঁটির পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে। এর আগে জুনে জামালপুর সদরের শ্মশানঘাটে নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনাও ঘটে। জেলার নানা জায়গায় গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভ সেই সময়ের সাক্ষ্য দেয়।
নদী, চর আর মাঠের জীবন
জামালপুরের ভূপ্রকৃতি মূলত সমতল পলিভূমি। যমুনার বুকে জেগে ওঠা চর, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের শান্ত বাঁক, ঝিনাই ও বানার নদী, আর বর্ষায় ভরে ওঠা বিল মিলিয়ে এখানে মানুষের জীবন নদীর ছন্দে বাঁধা। চরের মানুষ বন্যা আর ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচে, আবার সেই পলিই তাদের জমিতে ফসল দেয়। নদী এক বছর যে গ্রাম গিলে খায়, কয়েক বছর পর হয়তো অন্য জায়গায় নতুন চর তুলে দেয়; সেখানে আবার কাশবন, তারপর বসতি, তারপর বাদাম, মরিচ আর মিষ্টি আলুর খেত। বর্ষায় চরের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাওয়ার একমাত্র উপায় নৌকা। জেলার উত্তরে বকশীগঞ্জের দিকে গারো পাহাড়ের পাদদেশ শুরু হয়েছে, সেখানে লাল মাটি আর টিলার আভাস মেলে।
জীবিকার বড় অংশ কৃষি: ধান, পাট, আখ, সরিষা আর নানা সবজি। সরিষাবাড়ীর পাট আর তারাকান্দির যমুনা সার কারখানা জেলার পরিচিত নাম, দেওয়ানগঞ্জে চিনিকলের কারণে আখচাষের চল আছে। মাদারগঞ্জের মাছ-দুধ-ঘি আর ইসলামপুরের গুড়ও স্থানীয়ভাবে খ্যাত।
সুইয়ের ফোঁড়ে লেখা সংস্কৃতি
নকশিকাঁথা বানানোর পদ্ধতিটা সহজ মনে হলেও ধৈর্যের কাজ। পুরোনো শাড়ি বা লুঙ্গি কয়েক ভাঁজ করে বিছিয়ে, পাড় থেকে খোলা রঙিন সুতো দিয়ে চলে ছোট ছোট ফোঁড়। মাঝখানে পদ্ম বা চাকা, চারপাশে লতাপাতা, কোনায় হাতি-ঘোড়া, পালকি কিংবা মাছ—অনেক কাঁথায় নির্মাতার জীবনের গল্পও ঢুকে পড়ে। একেকটা বড় কাঁথা শেষ করতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে, আর কয়েকজন নারী মিলে একসঙ্গে কাজ করেন।
জামালপুরের নকশিকাঁথা এখন দেশজুড়ে পরিচিত। এক সময় এই শিল্প প্রায় হারাতে বসেছিল, পরে নানা উদ্যোগে গ্রামের নারীদের হাতে আবার প্রাণ পায়। আজ শহরের দোকানে নকশিকাঁথা, নকশি করা শাড়ি, কুশন কভার আর ব্যাগ সাজানো থাকে, আর এর পেছনে থাকে হাজারো নারীর ঘরে বসে কাজ। ইসলামপুরের কাঁসা-পিতলের বাসন, মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশ-বেতের কুলা-চালুনিও এখানকার পুরোনো কারুশিল্প।
লোকসংস্কৃতিতেও জামালপুর সমৃদ্ধ। গুনাইবিবির গান, পালাগান, বর্ষায় নৌকাবাইচ আর গ্রামের মেলায় ষাঁড়ের লড়াই এখানকার পুরোনো বিনোদন। মেলান্দহের ঝাউগড়ায় গান্ধী আশ্রম অবিভক্ত বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে; এখন সেখানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরও গড়ে উঠেছে। এই জেলার মানুষ হিসেবে পরিচিত মুখের মধ্যে আছেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান, নাট্যব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আল মামুন এবং চলচ্চিত্রকার ও লেখক আমজাদ হোসেন।
ঘুরে দেখার মতো জায়গা
জামালপুরে পর্যটনের ভিড় কম, তাই ঘোরাটা একটু নিরিবিলি:
- শহরের হযরত শাহ জামালের মাজার ও পুরোনো দয়াময়ী মন্দির
- বকশীগঞ্জের কামালপুর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ এবং গারো পাহাড়ের পাদদেশে লাউচাপড়া
- মেলান্দহের ঝাউগড়ার গান্ধী আশ্রম
- মাদারগঞ্জের পুরোনো নীলকুঠি
- পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীর, বিশেষ করে বিকেলের দিকে
খাবারের থালায় জামালপুর
জামালপুরের রান্নাঘর নদী আর গোয়ালঘর থেকে রসদ নেয়। ব্রহ্মপুত্র আর যমুনার মাছ দিয়ে রাঁধা মাছের ঝোল এখানে প্রতিদিনের খাবার: কখনো আলু-বেগুন দিয়ে পাতলা ঝোল, কখনো সরিষা বাটা দিয়ে ঘন। দুধের প্রাচুর্য থেকে এসেছে মিষ্টির ঐতিহ্য; ছানার পায়েস এখানে উৎসব-আপ্যায়নের পরিচিত পদ, ঘন ক্ষীরের ভেতর ছোট ছোট ছানার গুটি। শীত এলে ঘরে ঘরে চালের গুঁড়ি কোটা হয়, খেজুর আর আখের গুড় দিয়ে বানানো হয় ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা আর নানা রকম পিঠা।
তবে জামালপুরের একেবারে নিজস্ব পদটির নাম মেন্দা, কোথাও কোথাও যাকে মিল্লি বা পিঠালি বলে। চালের গুঁড়া, মাংস আর আলু দিয়ে ঘন করে রাঁধা এই খাবার বিয়ে, মিলাদ বা বড় আয়োজনে বড় হাঁড়িতে রান্না হয়, ভাত আর মাষকলাইয়ের ডালের সঙ্গে পাতে পড়ে। কোন দোকানে কী পাওয়া যায় আর কোন পদ কেমন, তার বিস্তারিত দেখতে পারেন জামালপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাওয়া-আসা ও ভালো সময়
ঢাকা থেকে জামালপুরে সড়কপথে বাসে যাওয়া যায়, আবার রেলপথেও নিয়মিত ট্রেন চলে; জামালপুর একটি পুরোনো রেল জংশন হওয়ায় অনেকেই ট্রেনে যেতে পছন্দ করেন। ঘোরার জন্য শীতকাল সবচেয়ে আরামদায়ক, তখন পিঠা আর গুড়ের মৌসুমও চলে। বর্ষায় নদী আর চর অন্য রূপ নেয়, তবে বন্যার খবর জেনে বের হওয়াই ভালো।
সাধারণ প্রশ্ন
জামালপুর নামের উৎপত্তি কী?
প্রচলিত আছে, মোগল আমলে ইয়েমেন থেকে আসা সুফি সাধক হযরত শাহ জামালের নাম থেকে জামালপুর নাম এসেছে। এর আগে এলাকাটি সিংহজানি নামে পরিচিত ছিল বলে জানা যায়।
জামালপুর কিসের জন্য বিখ্যাত?
জামালপুর নকশিকাঁথা ও হাতের কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের কামালপুর রণাঙ্গন, যমুনা সার কারখানা এবং ছানার পায়েস ও মেন্দার মতো খাবারের জন্যও জেলাটির নাম আছে।
জামালপুর কবে জেলা হয়?
ব্রিটিশ আমলে ১৮৪৫ সালে জামালপুর মহকুমা গঠিত হয়। পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে এর যাত্রা শুরু ১৯৭৮ সালে।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh