ঝিনাইদহ জেলা: ঝিনুকের নদী থেকে বটের ছায়া
খুলনা বিভাগ · ৬টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
কালীগঞ্জের বেথুলী গ্রামে একটি বটগাছের নিচে দাঁড়ালে বোঝা কঠিন কোনটা মূল গাছ আর কোনটা তার ঝুরি থেকে জন্মানো নতুন কাণ্ড। কয়েক বিঘা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই মল্লিকপুরের বটগাছের মতোই ঝিনাইদহ জেলার ইতিহাসও ছড়ানো, শিকড় অনেক গভীরে। সুলতানি আমলের মসজিদ, জমিদারদের মন্দির, লোককবির গান আর একাত্তরের বীরত্ব, সব মিলে খুলনা বিভাগের এই জেলাটি দক্ষিণ-পশ্চিমের এক শান্ত অথচ গল্পে ভরা জনপদ।
ঝিনুক থেকে ঝিনাইদহ
ঝিনাইদহ নামের উৎস নিয়ে নিশ্চিত কোনো দলিল নেই, তবে সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি নদীর সঙ্গে জড়ানো। নবগঙ্গা নদীতে এক সময় প্রচুর ঝিনুক পাওয়া যেত, মানুষ সেগুলো তুলে চুন তৈরি করত। স্থানীয় ভাষায় ঝিনুককে "ঝিনেই" বলা হতো, আর নদীর গভীর জায়গাকে "দহ"। এই দুই শব্দ মিলে নাম দাঁড়ায় ঝিনেইদহ, পরে ঝিনাইদহ। প্রচলিত আছে, এক ইংরেজ কর্মকর্তা ঝিনুক কুড়ানো মানুষদের কাছে জায়গার নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর ভুল বোঝাবুঝিতে উত্তরটাই নাম হয়ে যায়। গল্পটা সত্যি না হলেও নামের মধ্যে নদী আর ঝিনুকের স্মৃতি যে রয়ে গেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
সুলতানি টাকশাল থেকে ব্রিটিশ মহকুমা
ঝিনাইদহের প্রাচীন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ কালীগঞ্জের বারোবাজার। মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসা একের পর এক মসজিদ আর দিঘি জানান দেয়, সুলতানি আমলে এখানে এক সমৃদ্ধ নগর ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান জালালুদ্দিন মুহম্মদ শাহের সময়ের একটি টাকশাল শহরের অবস্থানও এই অঞ্চলে ছিল। লোকমুখে বারোবাজার জড়িয়ে আছে গাজী, কালু ও চম্পাবতীর কিংবদন্তির সঙ্গে, যে কাহিনি নিয়ে গাজীর গান গাওয়া হতো গ্রামে গ্রামে।
মহেশপুরের দিকে ঢোলসমুদ্র দিঘিকে ঘিরেও রাজা মুকুট রায়ের আমলের নানা গল্প চালু আছে। ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে ঝিনাইদহ ছিল একটি পুলিশ ফাঁড়ি, ১৭৯৩ সালে এটি থানা হয় এবং ১৮৬২ সালে যশোর জেলার অধীনে মহকুমা গঠিত হয়। শৈলকুপা ও নলডাঙ্গার জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ সেই সময়ের ভূস্বামীদের প্রভাবের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৮৪ সালে ঝিনাইদহ পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।
একাত্তর ও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকেই ঝিনাইদহে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এপ্রিলের মাঝামাঝি কালীগঞ্জের দুলালমুন্দিয়া ও সদরের বিষখালীতে বেগবতী নদীর তীরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়। শৈলকুপার কামান্নায় একসঙ্গে বহু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, কামান্না এখন সেই স্মৃতির জায়গা। জেলায় কয়েকটি গণকবর ও বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে।
এই জেলার মহেশপুর উপজেলার খোর্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান। একাত্তরের অক্টোবরে সিলেট সীমান্তের ধলই এলাকায় এক অভিযানে তিনি শহীদ হন। তাঁর গ্রামের নাম এখন হামিদনগর, সেখানে তাঁর নামে স্মৃতি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর গড়ে উঠেছে।
নদী, বিল, বাঁওড় আর মাঠ
গড়াই, কুমার, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেগবতী, কপোতাক্ষ: এই নদীগুলো ঝিনাইদহের মাটিকে উর্বর করেছে। জেলায় অনেকগুলো বাঁওড় আছে, যেমন মহেশপুরের দিকের বাঁওড়গুলো, যেখানে মাছ চাষ বহু পরিবারের জীবিকা। বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর: ধান, পাট, আখ, গম, সরিষা, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ আর পান এখানে প্রচুর হয়। কালীগঞ্জের মোবারকগঞ্জ চিনিকল আশপাশের আখচাষিদের ভরসা। কোটচাঁদপুর এক সময় খেজুর গুড় থেকে চিনি তৈরির বড় কেন্দ্র ছিল বলে পুরোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়।
গত কয়েক দশকে ঝিনাইদহের কৃষিতে নতুন রং লেগেছে। মাঠে মাঠে কলা, পেঁপে, পেয়ারার বাগান, কোথাও কোথাও ড্রাগন ফলের চাষ, আর শীতে বিস্তীর্ণ জমিতে পেঁয়াজ-রসুন। ঝিনাইদহের পান আর পটোল ট্রাকে করে ঢাকাসহ নানা শহরে যায়। গ্রামের হাটগুলো তাই সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে ওঠে, ভোর থেকেই ভ্যান আর নসিমনের সারি। প্রবাসী আয়ও জেলার অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে, গ্রামের নতুন পাকা বাড়িগুলোতে তার ছাপ স্পষ্ট।
লোককবি, কবি আর গানের ধারা
ঝিনাইদহের মাটি থেকে উঠে এসেছেন লোককবি পাগলা কানাই, যাঁর ধুয়া গান ও জারি গান এখনো গ্রামের আসরে গাওয়া হয়। শৈলকুপার মনোহরপুরে জন্ম কবি গোলাম মোস্তফার, যাঁর লেখা কবিতা ও ইসলামি গান এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে পরিচিত ছিল। লালনের প্রভাবও এখানে প্রবল, শৈলকুপা আর হরিণাকুণ্ডুর দিকে বাউল আখড়া চোখে পড়ে। হরিণাকুণ্ডুর হরিশপুর গ্রামকে কেউ কেউ লালন সাঁইয়ের জন্মস্থান বলে দাবি করেন, যদিও এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। শীতের রাতে গ্রামের উঠানে বাউল গান আর পালাগানের আসর এখনো বসে, শ্রোতারা খড় বিছিয়ে বসে ভোর পর্যন্ত গান শোনেন।
দর্শনীয় স্থান
ঝিনাইদহ ঘুরতে হলে কালীগঞ্জ দিয়ে শুরু করাই ভালো। বারোবাজারে গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদসহ সুলতানি আমলের কয়েকটি পোড়ামাটির স্থাপনা ঘুরে দেখা যায়। কাছেই নলডাঙ্গার জমিদারদের তৈরি মন্দির কমপ্লেক্স, যেখানে কয়েকটি মন্দির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। বেথুলীর মল্লিকপুর বটগাছ প্রচলিত মতে এশিয়ার সবচেয়ে বড় বটগাছগুলোর একটি, এর ছায়ায় একটা দুপুর কাটানো যায় অনায়াসে। শৈলকুপায় রয়েছে মুঘল ধাঁচের শৈলকুপা শাহী মসজিদ, আর মহেশপুরে ঢোলসমুদ্র দিঘি ও বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিজাদুঘর। ঝিনাইদহ শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নবগঙ্গার পাড়েও বিকেলে হাঁটা যায়, সেই নদী যার ঝিনুক থেকে জেলার নাম। প্রত্নস্থানগুলো ছড়ানো বলে ইজিবাইক বা ভাড়ার গাড়ি নিয়ে ঘোরা সুবিধাজনক, আর বারোবাজারে স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিলে প্রতিটি ঢিবির পেছনের গল্পও শোনা যায়।
গুড়, পিঠা আর দই
ঝিনাইদহের রান্নাঘরে শীত আসে খেজুর গুড়ের হাত ধরে। যশোর-চুয়াডাঙ্গার মতো এখানেও কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত গাছিদের ব্যস্ত সময়। কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, কালীগঞ্জের হাটে শীতের সকালে মাটির ভাঁড়ে ঝোলা গুড় আর পাটালির সারি চোখে পড়ে। এই গুড় দিয়েই বানানো হয় ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা আর দুধপুলি। গ্রামে নতুন ধান উঠলে পিঠার আয়োজন যেন উৎসবে রূপ নেয়, মেয়ের বাড়িতে পিঠা পাঠানোর রেওয়াজও আছে।
দই-মিষ্টির প্রতিও ঝিনাইদহের মানুষের আলাদা টান। মাটির হাঁড়িতে জমানো মিষ্টি দই বিয়ে, আকিকা কিংবা হাটবারের বাজারে সমান জনপ্রিয়। কিছু দোকানে শীতে খেজুর গুড় দিয়েও দই জমানো হয়, তাতে হালকা পোড়া-মিষ্টি একটা স্বাদ আসে। জেলার খাবার নিয়ে আরও জানতে পড়ুন ঝিনাইদহের বিখ্যাত খাবার।
যাওয়ার উপায় ও ভালো সময়
ঢাকা থেকে ঝিনাইদহে মূলত সড়কপথেই যাওয়া হয়, বাসে যাত্রা সরাসরি। রেলপথে যেতে চাইলে খুলনাগামী ট্রেনে কোটচাঁদপুর বা কাছের স্টেশনে নেমে সড়কপথে বাকিটা যাওয়া যায়। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে ভালো সময়, তখন গুড়ের মৌসুম, রাস্তা শুকনো আর পুরোনো মসজিদগুলো ঘুরে দেখার আবহাওয়াও আরামদায়ক।
সাধারণ প্রশ্ন
ঝিনাইদহ নামের অর্থ কী?
প্রচলিত মতে, নবগঙ্গা নদীর ঝিনুক বা স্থানীয় ভাষায় "ঝিনেই" এবং গভীর জলাশয় "দহ" মিলে ঝিনাইদহ নামের উৎপত্তি।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের বাড়ি কোথায়?
তাঁর জন্ম ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোর্দ খালিশপুর গ্রামে, যা এখন হামিদনগর নামে পরিচিত।
ঝিনাইদহে একদিনে কী কী দেখা যায়?
একদিনে কালীগঞ্জের বারোবাজারের প্রাচীন মসজিদ, নলডাঙ্গার মন্দির আর বেথুলীর মল্লিকপুর বটগাছ ঘুরে দেখা সম্ভব।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh