জয়পুরহাট জেলা: আখের মাঠ, আলুর হাট আর রেলের শহর
রাজশাহী বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
অনেক শহর গড়ে ওঠে নদীর ঘাট ঘিরে, কোনোটা রাজবাড়ি ঘিরে। জয়পুরহাটের গল্পটা আলাদা; এই শহরের জন্মের পেছনে বড় ভূমিকা একটি রেলস্টেশনের। উনিশ শতকের শেষ দিকে রেললাইন এসে পৌঁছানোর পর পুরোনো হাট-বাজার ফিকে হয়ে যায়, আর স্টেশনকে ঘিরে জমে ওঠে নতুন জনপদ। আজকের জয়পুরহাট জেলা রাজশাহী বিভাগের ছোট জেলাগুলোর একটি, কিন্তু আলু, আখ আর ধানের ফলনে উত্তরাঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ খামার। পশ্চিমে ভারতের সীমান্ত, পূর্বে বগুড়া, উত্তরে দিনাজপুর আর দক্ষিণে নওগাঁ।
রাজস্থানের জয়পুর থেকে বাংলার জয়পুরহাট
জয়পুরহাট নামটির পেছনে একটি কৌতূহলী গল্প প্রচলিত আছে। ব্রিটিশ আমলে রাজস্থানের জয়পুর ও মাড়োয়ার অঞ্চল থেকে আসা অনেক ব্যবসায়ী এই এলাকায় বসতি গড়েন। খঞ্জনপুরের নীলকুঠির আশপাশের এলাকা সে সূত্রে জয়পুর নামে পরিচিত হতে থাকে। এখানে যখন রেলস্টেশন তৈরি হয়, তখন স্টেশনের নাম রাখা হয় জয়পুরহাট, যাতে রাজস্থানের জয়পুরের সঙ্গে গুলিয়ে না যায়। সরকারি কাগজে অনেক দিন এলাকাটির নাম ছিল গোপেন্দ্রগঞ্জ, কিন্তু পরে ডাকঘর আর থানাও স্টেশনের নাম নেয়, এবং মানুষের মুখে মুখে জয়পুরহাটই স্থায়ী হয়ে যায়।
বরেন্দ্রের প্রান্ত থেকে আলাদা জেলা
প্রাচীন কালে এই অঞ্চল ছিল পুণ্ড্রবর্ধন ও বরেন্দ্র ভূমির অংশ। পাশের নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার জয়পুরহাট শহর থেকে খুব দূরে নয়, ফলে পাল আমলের বৌদ্ধ সংস্কৃতির ছায়া এই অঞ্চলেও পড়েছিল। পাঁচবিবির পাথরঘাটা প্রত্নস্থল সেই পুরোনো অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়।
ব্রিটিশ আমলে এলাকাটি ১৮২১ সালে গঠিত বগুড়া জেলার অংশ হয়। ছোট যমুনার ভাঙনে লালবাজারের পুরোনো থানা সরিয়ে নেওয়া হয় পাঁচবিবিতে। তারপর ১৮৮৪ সালে এই অঞ্চলে রেলপথ চালু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র সরে আসে স্টেশনের দিকে। পুরোনো নদীঘাটের হাটগুলো ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারায়, আর স্টেশনের চারপাশে গুদাম, আড়ত আর দোকানপাট নিয়ে নতুন শহর জমে ওঠে। ধান, পাট আর আখ রেলে চেপে দূরের বাজারে যেতে শুরু করে, যা এলাকার কৃষি অর্থনীতিকে নতুন গতি দেয়। ১৯৭১ সালে জয়পুরহাট মহকুমা হয়, আর ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
মুক্তিযুদ্ধে জয়পুরহাট ছিল ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ জয়পুরহাট সদরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী পাঁচবিবি বাজারে হামলা চালিয়ে আগুন দেয়। বছরজুড়ে কয়েকটি জায়গায় নির্মম গণহত্যা হয়; এর মধ্যে পাগলা দেওয়ান এলাকার হত্যাকাণ্ড সবচেয়ে বেশি আলোচিত। জেলায় একাধিক গণকবর শনাক্ত হয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর জয়পুরহাট শত্রুমুক্ত হয়।
ছোট যমুনা, তুলসীগঙ্গা আর উর্বর মাটি
জয়পুরহাটের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ছোট যমুনা, তুলসীগঙ্গা আর হারাবতী নদী। বড় নদী না থাকায় জেলার বেশির ভাগ জমি বন্যামুক্ত সমতল, যা চাষের জন্য খুব উপযোগী। এখানকার মানুষের প্রায় পুরো অর্থনীতি কৃষিনির্ভর, আর জেলাটিকে উত্তরের শস্যভান্ডারগুলোর একটি বলা হয়। ধান, গম, পাট, সরিষার পাশাপাশি আলু চাষে জয়পুরহাট দেশের শীর্ষ জেলাগুলোর কাতারে। স্থানীয় কৃষি দপ্তরের হিসাবে প্রতি মৌসুমে এখানে কয়েক লাখ টন আলু ওঠে, যার কিছু অংশ বিদেশেও যায়। পাঁচবিবির লতিরাজ কচু, গোপালপুর হাটের শসা আর দুর্গাদহ হাটের কলাও পাইকারদের কাছে পরিচিত নাম।
জেলার শিল্পের মূল ভরসা জয়পুরহাট চিনিকল। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারি চিনিকল দেশের বড় চিনিকলগুলোর একটি। শীতের মাড়াই মৌসুমে আখবোঝাই গরুর গাড়ি আর ট্রলির সারি মিলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকে, যা এই জেলার এক পরিচিত দৃশ্য। আলু তোলার মৌসুমে, অর্থাৎ ফাল্গুন-চৈত্রে, জয়পুরহাটের গ্রামগুলোর চেহারা বদলে যায়। খেতজুড়ে বস্তা ভরা আলুর স্তূপ, পাইকারদের ট্রাক, আর হিমাগারের সামনে লম্বা সারি। ভালো দাম পেলে কৃষকের মুখে হাসি, দাম পড়ে গেলে দুশ্চিন্তা; আলুর বাজারের ওঠানামা এখানে প্রায় প্রতিটি পরিবারের হিসাবের সঙ্গে জড়ানো। জেলাজুড়ে গড়ে ওঠা হিমাগারগুলো সারা বছর আলু সংরক্ষণ করে, যাতে মৌসুম শেষেও বাজারে জোগান থাকে।
মাটির অনেক গভীরে জামালগঞ্জ এলাকায় কয়লা ও চুনাপাথরের মজুতও শনাক্ত হয়েছে, যদিও তা এখনো তোলা হয়নি।
মানুষ, গান আর সংস্কৃতি
জয়পুরহাটে বাঙালির পাশাপাশি সাঁওতাল, ওরাওঁ ও মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস আছে, তাঁদের উৎসব আর নাচ-গান জেলার সংস্কৃতিতে আলাদা রং যোগ করে। গ্রামের দিকে লোকগান আর যাত্রাপালার চল এখনো টিকে আছে। খেতলালের হিন্দা-কসবা শাহি জামে মসজিদ আর আক্কেলপুরের গোপীনাথপুর মন্দির দুই ধর্মের মানুষের কাছেই পরিচিত স্থান। পাঁচবিবির বানিয়াপাড়া মাদ্রাসা অষ্টাদশ শতকের প্রতিষ্ঠান বলে পরিচিত। শিক্ষার দিক থেকে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত জয়পুরহাট সরকারি কলেজ জেলার পুরোনো প্রতিষ্ঠান, আর মেয়েদের ক্যাডেট কলেজও এই জেলায়।
দেখার মতো জায়গা
জয়পুরহাটে পাহাড়-সমুদ্র নেই, আছে শান্ত দীঘি আর পুরোনো স্থাপনা। কালাই উপজেলার নান্দাইল দীঘি বিশাল জলাধার, এর পাড়ে বিকেলে বসে থাকা স্থানীয়দের প্রিয় অবসর। পাঁচবিবির পাথরঘাটা প্রত্নস্থলে নিমাই পীরের মাজারও আছে। একই উপজেলায় লকমা জমিদারবাড়ির পুরোনো দালান এখন জীর্ণ হলেও দেখার মতো। খেতলালের আছরাঙ্গা দীঘি আর শহরের শিশু উদ্যান পরিবার নিয়ে ঘোরার জায়গা। শহর থেকে খুব কাছেই পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, তাই জয়পুরহাটে থেকে সেখানে দিনে দিনে ঘুরে আসা যায়।
জয়পুরহাটের পাতে কী থাকে
এমন আখের দেশে শীতকালে রাস্তার ধারে আখের রসের ঠেলাগাড়ি থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। মেশিনে চাপ দিয়ে বের করা ঠান্ডা রস, একটু লেবু আর বিট লবণ মিশিয়ে, হাটের দিনে ক্লান্ত কৃষকের তৃষ্ণা মেটায়। আলুর জেলা বলে আলু ভর্তা এখানে প্রায় প্রতিদিনের খাবার; নতুন আলু সেদ্ধ করে সর্ষের তেল, পেঁয়াজ আর পোড়া মরিচে মেখে গরম ভাতের সঙ্গে। শীতের সকালে নতুন ধানের চালের গুঁড়ায় ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা আর খেজুর গুড়ের ঘ্রাণ ছড়ায় গ্রামের উঠোনে। নবান্নের সময় পিঠার আয়োজন আরও বড় হয়। এখানকার খাবারের তালিকা দেখতে পারেন জয়পুরহাটের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাত্রার খুঁটিনাটি
ঢাকা থেকে জয়পুরহাট যাওয়া যায় সড়কপথে, যমুনা সেতু পার হয়ে বগুড়া হয়ে। রেলপথও বেশ জনপ্রিয়, কারণ জয়পুরহাট উত্তরবঙ্গের প্রধান রেললাইনের ওপর পড়ে এবং ঢাকা থেকে উত্তরগামী কয়েকটি ট্রেন এখানে থামে। ঘোরার সেরা সময় শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি; তখন চিনিকলে মাড়াই চলে, মাঠে আলুর সবুজ চারা আর হাটে আখের রসের ভিড়।
সাধারণ প্রশ্ন
জয়পুরহাট নামের সঙ্গে রাজস্থানের জয়পুরের কী সম্পর্ক?
প্রচলিত আছে, ব্রিটিশ আমলে জয়পুর ও মাড়োয়ার থেকে আসা ব্যবসায়ীদের বসতির কারণে এলাকাটি জয়পুর নামে পরিচিত হয়। রেলস্টেশনের নাম জয়পুরহাট রাখা হয়, পরে সেটিই জেলার নাম হয়ে যায়।
জয়পুরহাট জেলা কবে গঠিত হয়?
জয়পুরহাট আগে বগুড়া জেলার অংশ ছিল, ১৯৭১ সালে মহকুমা হয়। ১৯৮৪ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
জয়পুরহাট কোন ফসলের জন্য পরিচিত?
জয়পুরহাট আলু উৎপাদনে দেশের অন্যতম শীর্ষ জেলা, আখ ও ধানেও এগিয়ে। জেলার চিনিকলটি দেশের বড় চিনিকলগুলোর একটি।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh