Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

খাগড়াছড়ি জেলা: পাহাড়, ঝরনা আর বৈসাবির দেশ

চট্টগ্রাম বিভাগ · ৮টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. খাগড়ার বন থেকে নাম
  2. পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আলাদা জেলা
  3. তিন নদী আর পাহাড়ের জীবিকা
  4. বৈসাবির রঙ
  5. পাহাড়ের পথে যা দেখবেন
  6. বাঁশ কোড়ল আর পাহাড়ি স্বাদ
  7. পথের খোঁজ ও সময়
  8. সাধারণ প্রশ্ন

আলুটিলার গুহায় ঢোকার আগে হাতে একটা মশাল ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, পায়ের নিচে ঠান্ডা পানির স্রোত, মাথার ওপর পাথরের ছাদ এত নিচু যে কোথাও কোথাও মাথা নিচু করে হাঁটতে হয়। মিনিট দশেক পর অন্য মুখ দিয়ে আলোয় বেরিয়ে এলে নিচে দেখা যায় সবুজ পাহাড়ে ঘেরা খাগড়াছড়ি শহর, তার মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা চেঙ্গী নদী। খাগড়াছড়ি জেলা এমনই এক জায়গা, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষের সংস্কৃতি দুটোই সমতলের চেয়ে আলাদা ছন্দে চলে। এখানে বাঙালির পাশাপাশি বাস করেন চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষ, যাঁদের ভাষা, পোশাক, উৎসব আর রান্না এই জেলাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়।

খাগড়ার বন থেকে নাম

খাগড়াছড়ি নামের উৎস নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি বেশ সরল। "ছড়ি" বা ছড়া মানে পাহাড়ি ছোট নদী বা ঝিরি। প্রচলিত আছে, এখানকার একটি ছড়ার দুই পাড়ে প্রচুর খাগড়া নামের নলখাগড়া জাতীয় ঘাস জন্মাত। সেই খাগড়া বন পরিষ্কার করে বসতি গড়ে ওঠার পর ছড়াটির নাম হয় খাগড়াছড়ি, আর পরে সেই নামেই পরিচিত হয় পুরো জনপদ। পার্বত্য অঞ্চলের আরও অনেক জায়গার নামের শেষে "ছড়ি" দেখা যায়, যা এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিরই প্রতিফলন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আলাদা জেলা

খাগড়াছড়ির অঞ্চলটি দীর্ঘদিন বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ ছিল। ব্রিটিশ সরকার ১৮৬০ সালে চট্টগ্রাম থেকে পাহাড়ি অঞ্চলকে আলাদা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠন করে। ঐতিহ্যগতভাবে এই অঞ্চল তিনটি সার্কেলে বিভক্ত ছিল, যার একটি মং সার্কেল; এর রাজার আসন মানিকছড়িতে, আর সেখানকার পুরোনো মং রাজবাড়ি আজও ইতিহাসের সাক্ষী। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সময় প্রথমে বান্দরবান আলাদা হয়, আর ১৯৮৩ সালে খাগড়াছড়ি পৃথক জেলার মর্যাদা পায়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রামগড় সীমান্ত এলাকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ পথ, কারণ ফেনী নদীর ওপারেই ভারতের ত্রিপুরা। ১৯৭১ সালের আগস্টে রামগড় উপজেলার মহামুনি পাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। জেলায় একটি গণকবর ও কয়েকটি স্মৃতিস্তম্ভ সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

তিন নদী আর পাহাড়ের জীবিকা

খাগড়াছড়ির প্রধান তিন নদী চেঙ্গী, মাইনী আর ফেনী। চেঙ্গী জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়ে রাঙামাটির দিকে কাপ্তাই হ্রদে মিশেছে, আর মাইনী দীঘিনালা হয়ে বয়ে চলে। নদীর উপত্যকায় সমতল জমিতে ধানের চাষ হয়, কিন্তু পাহাড়ের ঢালে চাষের পদ্ধতি একেবারে আলাদা। এখানে জুম চাষের প্রচলন বহু পুরোনো: পাহাড়ের এক টুকরো জমিতে একসঙ্গে ধান, মারফা, তিল, মরিচ, ভুট্টা আর নানা সবজি বোনা হয়।

আদা, হলুদ, আনারস, কলা, আম আর কাঁঠাল এখানকার কৃষির বড় অংশ। পাহাড়ি আনারস আর কলা ট্রাকে করে চলে যায় চট্টগ্রাম ও ঢাকার বাজারে। মানিকছড়ির সেমুতাং এলাকায় গ্যাসক্ষেত্র আছে, আর পাহাড়ে সেগুনসহ মূল্যবান কাঠের বাগান দেখা যায়। পর্যটন গত কয়েক দশকে জীবিকার নতুন উৎস হয়ে উঠেছে।

বৈসাবির রঙ

খাগড়াছড়ির সবচেয়ে রঙিন সময় চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরু। এই সময় ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই আর চাকমাদের বিজু উৎসব একসঙ্গে চলে, আর তিনটি নামের আদ্যক্ষর মিলিয়ে সবাই একে ডাকে বৈসাবি। বিজুর ভোরে নদীতে ফুল ভাসানো হয়, সাংগ্রাইয়ে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে আনন্দ করেন, আর ঘরে ঘরে রান্না হয় নানা পদের সবজি মিশিয়ে "পাজন"। অতিথি যেই আসুক, তাকে আপ্যায়ন করাই এই উৎসবের রীতি।

পাহাড়ি নারীদের কোমর তাঁতে বোনা পিনন-হাদি আর রঙিন কাপড় এই জেলার হস্তশিল্পের বড় পরিচয়। বাঁশ ও বেতের ঝুড়ি, খাড়াং আর নানা গৃহস্থালি জিনিস হাটে বিক্রি হয়। সাপ্তাহিক হাটের দিনে পাহাড়ি পথ বেয়ে মানুষ পিঠে ঝুড়ি নিয়ে নামেন, যা খাগড়াছড়ির চেনা দৃশ্য। বৌদ্ধ বিহারগুলো এখানকার সামাজিক জীবনের কেন্দ্র, আর কঠিন চীবর দানের মতো উৎসবে বিহারে মানুষের ঢল নামে। লেখক ও গবেষক প্রশান্ত ত্রিপুরা এই জেলার মানুষ।

পাহাড়ের পথে যা দেখবেন

  • আলুটিলা গুহা: শহর থেকে খুব কাছে, মশাল হাতে প্রাকৃতিক সুড়ঙ্গ পার হওয়ার অভিজ্ঞতা।
  • রিছাং ঝরনা: আলুটিলার কাছেই, পাথরের ঢাল বেয়ে নামা পানির ধারা।
  • দেবতার পুকুর: মাটিরাঙ্গার পাহাড়চূড়ায় একটি জলাশয়, যাকে ঘিরে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও মেলা জড়িয়ে আছে।
  • মায়াবিনী লেক: পানছড়ির দিকে পাহাড়ঘেরা শান্ত জলাশয়।
  • মং রাজবাড়ি: মানিকছড়িতে মং সার্কেল প্রধানের ঐতিহাসিক বাসস্থান।
  • সাজেকের পথ: রাঙামাটি জেলার সাজেক যেতে বেশির ভাগ পর্যটক খাগড়াছড়ি ও দীঘিনালা হয়েই যান।

বাঁশ কোড়ল আর পাহাড়ি স্বাদ

খাগড়াছড়ির রান্নাঘরে ঢুকলে প্রথমেই নাকে আসে বাঁশ আর পাহাড়ি মশলার গন্ধ। বর্ষায় কচি বাঁশের অঙ্কুর, যাকে বলে বাঁশ কোড়ল, পাহাড় থেকে তুলে আনা হয়। পাতলা করে কেটে সেদ্ধ করে মরিচ আর সামান্য শুঁটকি দিয়ে রান্না করা হয়, কখনো মুরগির মাংসের সঙ্গে। অনেক পরিবারে কাঁচা বাঁশের চোঙের ভেতর মাছ বা মুরগি মশলা মেখে আগুনে পোড়ানো হয়, যাকে লোকে বাঁশ-রান্না বলে চেনে; এতে খাবারে বাঁশের হালকা সুবাস ঢোকে।

পাহাড়ি রান্নায় তেলের ব্যবহার কম, সেদ্ধ আর ভাপে রান্নার চল বেশি। মারমা ও চাকমা রান্নায় নাপ্পি বা শুঁটকি মাছের পেস্ট স্বাদের মূল ভিত। পাহাড়ি আনারস এখানে এত মিষ্টি যে রাস্তার পাশের দোকানে কেটে লবণ-মরিচ ছিটিয়ে বিক্রি হয়, আর পাকা কলার কাঁদি ঝুলতে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি হাটে। হাটে গেলে আরও অনেক অচেনা উপকরণ চোখে পড়ে: বুনো কচু, নানা জাতের পাহাড়ি শাক, জুমের ছোট ছোট মরিচ আর মারফা নামের শসাজাতীয় সবজি। চাকমা রান্নায় "হেবাং" নামে একটি পদ আছে, যেখানে মাছ বা মাংস মশলা মেখে কলাপাতায় মুড়ে আগুনের আঁচে রান্না করা হয়। বিন্নি চালের ভাত আর বিন্নি চালের পিঠাও উৎসবে অতিথিদের জন্য বানানো হয়। এসব খাবারের হদিস নিতে দেখুন খাগড়াছড়ির বিখ্যাত খাবার।

পথের খোঁজ ও সময়

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার মূল উপায় সড়কপথ; সরাসরি বাস চলে, আর পথের শেষ অংশে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা যাত্রাকে রোমাঞ্চকর করে তোলে। কেউ কেউ ট্রেনে ফেনী বা চট্টগ্রাম পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে বাসে আসেন। ঝরনা ভরা দেখতে চাইলে বর্ষার শেষ, মোটামুটি আগস্ট থেকে অক্টোবর ভালো সময়। আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য শীতকাল উপযুক্ত, আর বৈসাবি দেখতে চাইলে যেতে হবে চৈত্রের শেষ সপ্তাহে।

সাধারণ প্রশ্ন

বৈসাবি উৎসব কী?

ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই আর চাকমাদের বিজু উৎসবের আদ্যক্ষর মিলিয়ে বৈসাবি নামটি এসেছে। চৈত্রের শেষ ও বৈশাখের শুরুতে পার্বত্য অঞ্চলে এই উৎসব পালিত হয়।

আলুটিলা গুহা কোথায়?

আলুটিলা গুহা খাগড়াছড়ি শহরের কাছে আলুটিলা পাহাড়ে অবস্থিত। গুহার ভেতরে অন্ধকার থাকায় মশাল বা টর্চ নিয়ে ঢুকতে হয়।

বাঁশ কোড়ল কী?

বাঁশ কোড়ল হলো কচি বাঁশের অঙ্কুর, যা পার্বত্য অঞ্চলে সবজি হিসেবে রান্না করা হয়। বর্ষাকালে এটি সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

খাগড়াছড়ির খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ খাগড়াছড়ির খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 চট্টগ্রাম বিভাগের অন্য জেলা