কিশোরগঞ্জ জেলা: উজান-ভাটির মিলনভূমি
ঢাকা বিভাগ · ১৩টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
বর্ষার শেষে নিকলীর বেড়িবাঁধে দাঁড়ালে চোখের সামনে যত দূর দেখা যায়, শুধু জল আর জল। দূরে একটা গ্রাম যেন দ্বীপের মতো ভাসছে, জেলেদের নৌকা ঢেউয়ে দুলছে। অথচ শুকনো মৌসুমে এই একই জায়গা বোরো ধানের সবুজ মাঠ। কিশোরগঞ্জ জেলা এমন বদলে যাওয়া প্রকৃতির দেশ, যার পশ্চিমে পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের উজান আর পূর্বে মেঘনা-ঘেরা হাওরের ভাটি। জেলার নিজস্ব স্লোগানেও তাই উজান-ভাটির মিলিত ধারা আর মাছভরা হাওরের কথা। এই জনপদেই জন্ম নিয়েছেন বাংলার প্রথম নারী কবি বলে পরিচিত চন্দ্রাবতী, আর এখানেই বসে দেশের অন্যতম বড় ঈদ জামাত।
নামকরণের লোককথা
কিশোরগঞ্জ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক জমিদার পরিবারের গল্প। প্রচলিত আছে, ব্রজকিশোর প্রামাণিক বা তাঁর পরিবারের নন্দকিশোর নামে কেউ নদীর তীরে একটি হাট বা গঞ্জ বসিয়েছিলেন। সেই কিশোরের গঞ্জ থেকেই ধীরে ধীরে জায়গার নাম হয় কিশোরগঞ্জ। ঠিক কার নামে এবং কবে, তা নিয়ে নিশ্চিত দলিল নেই, তবে গঞ্জকে কেন্দ্র করে শহর গড়ে ওঠার কাহিনি এ অঞ্চলের আরও অনেক নামের মতোই।
বারো ভূঁইয়া থেকে মহকুমা, তারপর জেলা
মধ্যযুগে এই অঞ্চল ছিল ভাটি বাংলার অংশ, আর ষোড়শ শতকে এখানে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈশা খাঁ। করিমগঞ্জ উপজেলার জঙ্গলবাড়িতে তাঁর একটি দুর্গ ছিল, যার মাটির প্রাচীর আর পরিখার চিহ্ন এখনো দেখা যায়। পাকুন্দিয়ার এগারসিন্দুরও ঈশা খাঁর সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, আর সেখানে মুঘল আমলের মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে। প্রচলিত আছে, মুঘল সেনাপতি মানসিংহের সঙ্গে ঈশা খাঁর লড়াইয়ের একটি অধ্যায় এই এলাকায় ঘটেছিল।
ব্রিটিশ আমলে কিশোরগঞ্জ ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার অংশ। ১৮৬০ সালে এখানে মহকুমা গঠিত হয়, আর ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জ পৌরসভা। ১৯৮৪ সালে কিশোরগঞ্জ আলাদা জেলার মর্যাদা পায়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কিশোরগঞ্জের হাওর আর নদীপথ মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের পথ হয়ে উঠেছিল। ভৈরবের হালগড়া ও সদরের বড়ইতলায় পাকিস্তানি বাহিনী বড় গণহত্যা চালায়, নিকলীতেও বহু মানুষ নিহত হন। অন্যদিকে হোসেনপুর থানা ও কুলিয়ারচরে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনী ক্ষতির মুখে পড়ে। অক্টোবরে নিকলী ও বাজিতপুর শত্রুমুক্ত হয়। মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী সৈয়দ নজরুল ইসলামও এই জেলার মানুষ।
হাওর, নদী আর জীবিকা
জেলার পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশ, বিশেষ করে ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম আর নিকলী, হাওর অঞ্চল। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এসব এলাকা জলমগ্ন থাকে, তখন গ্রামগুলো একেকটা দ্বীপ, আর চলাচলের ভরসা নৌকা। শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে জেগে ওঠা জমিতে একটিমাত্র বোরো ফসল ফলে, যা হাওরবাসীর সারা বছরের ভরসা। হাওরের মাঝ দিয়ে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামকে যুক্ত করা সড়ক এখন ভ্রমণকারীদের কাছেও আকর্ষণ।
জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে পুরোনো ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, কালনী, ধনু, ঘোড়াউত্রা আর শহরের বুক চিরে নরসুন্দা। ধান, পাট আর সবজির পাশাপাশি হাওরের মাছ ধরা এখানকার অর্থনীতির বড় স্তম্ভ। মেঘনার তীরের ভৈরব নদীবন্দর আর ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, সেখানে জুতা তৈরির বড় শিল্পও গড়ে উঠেছে।
জেলার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে মেঘনার তীরের ভৈরব কিশোরগঞ্জের প্রবেশদ্বার। এখানে মেঘনার ওপর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সড়ক ও রেলসেতু, যা ঢাকা থেকে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ। ভৈরবের মাছের আড়তে ভোরবেলা হাওর আর মেঘনা থেকে আসা মাছের নিলাম জমে ওঠে, সেখান থেকে মাছ যায় দেশের নানা প্রান্তে। হাওরের গ্রামে বর্ষাকালে অনেক পরিবার মাছ ধরা আর নৌকা চালিয়ে সংসার চালায়, শুকনো মৌসুমে আবার ফিরে যায় ধানের মাঠে। এই দুই মৌসুমের পালাবদলই হাওরপাড়ের মানুষের জীবনের ছন্দ ঠিক করে দেয়।
চন্দ্রাবতী, পালাগান আর গুণী মানুষ
কিশোরগঞ্জের সাহিত্যিক ঐতিহ্যের শুরু মধ্যযুগে। সদর উপজেলার পাতুয়াইর গ্রামে ফুলেশ্বরী নদীর তীরে জন্ম কবি চন্দ্রাবতীর, যিনি বাংলায় রামায়ণ রচনা করেছিলেন। তাঁর জীবনের বেদনার কাহিনি ময়মনসিংহ গীতিকার পালায় আজও গাওয়া হয়। গ্রামে এখনো তাঁর নামে পরিচিত শিবমন্দির আছে। ময়মনসিংহ গীতিকা নামে যে পালাগুলো খ্যাতি পেয়েছে, তার অনেকগুলোর জন্ম বৃহত্তর ময়মনসিংহের এই ভাটি অঞ্চলের গ্রামীণ আসরে।
আধুনিক কালেও এই জেলা অনেক গুণী মানুষ দিয়েছে। কটিয়াদীর মসূয়া গ্রামে জন্মেছিলেন শিশুসাহিত্যিক ও মুদ্রণশিল্পের পথিকৃৎ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, যাঁর উত্তরসূরিদের মধ্যে আছেন সুকুমার রায় ও সত্যজিৎ রায়। ইংরেজিতে লেখা আত্মজীবনীর জন্য পরিচিত লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরীর জন্ম কিশোরগঞ্জ শহরে।
কিশোরগঞ্জে ঘোরার জায়গা
শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে শোলাকিয়া ঈদগাহ, যেখানে প্রতি ঈদে লাখো মানুষ একসঙ্গে নামাজ পড়েন। প্রচলিত আছে, উনিশ শতকে এক জামাতে প্রায় সোয়া লাখ মুসল্লি হয়েছিলেন, আর সেই ‘সোয়া লাখ’ থেকেই নাম শোলাকিয়া। শহরের পাগলা মসজিদও পরিচিত, বিশেষ করে এর দানবাক্সে জমা হওয়া বিপুল অর্থের খবরের জন্য। এর বাইরে আছে জঙ্গলবাড়ি দুর্গ, এগারসিন্দুরের পুরোনো মসজিদ, পাতুয়াইরে চন্দ্রাবতীর শিবমন্দির, আর বর্ষায় নিকলীর হাওর ও মিঠামইনের হাওর সড়ক।
হাওরের রান্নাঘর
হাওরের মানুষের খাবারের কেন্দ্রে মাছ। বর্ষা আর শরতে জাল ফেললেই ওঠে রুই, কাতলা, বোয়াল, আইড়, চিতল আর ছোট দেশি মাছ। টাটকা মাছের ঝোল এখানে রান্না হয় সাধারণ উপকরণে: পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, কাঁচা মরিচ আর কখনো টমেটো বা লাউ। বোয়াল বা আইড়ের ঝাল ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া হাওরপাড়ের বড় আনন্দ।
পানি নেমে যাওয়ার মৌসুমে অতিরিক্ত মাছ রোদে শুকিয়ে বানানো হয় শুঁটকি। পুঁটি, চিংড়ি, টেংরা বা বাইম মাছের শুঁটকি ভর্তা কিংবা বেগুন-আলুর সঙ্গে ভুনা করে খাওয়া হয়, আর বর্ষায় যখন বাজারে যাওয়া কঠিন, তখন এই শুঁটকিই রান্নাঘরের ভরসা। শীতের সময় নতুন ধানের চাল গুঁড়ো করে তৈরি হয় ভাপা, চিতই আর তেলের পিঠা, অনেক বাড়িতে খেজুরের বা আখের গুড় দিয়ে। হাওরের নৌকায় ঘুরতে গেলে অনেক মাঝি নৌকাতেই চুলা জ্বালিয়ে সদ্য ধরা মাছ রান্না করে দেন; খোলা আকাশের নিচে জলের ওপর বসে সেই গরম ভাত আর ঝোল খাওয়ার অভিজ্ঞতা হাওর ভ্রমণের অন্যতম স্মৃতি হয়ে থাকে। শীতে হাওরপাড়ে পরিযায়ী হাঁসের ঝাঁকও চোখে পড়ে। জেলাজুড়ে প্রিয় খাবারের বিস্তারিত পাবেন কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাতায়াত ও সময়
ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ সড়কপথে বাসে যাওয়া যায়, আবার কমলাপুর থেকে রেলপথেও সরাসরি ট্রেন আছে। হাওর ঘুরতে হলে জেলা সদর বা ভৈরব থেকে নিকলী, ইটনা বা মিঠামইনের দিকে যেতে হয়, তারপর নৌকা। হাওরের জলরাশি দেখতে জুলাই থেকে অক্টোবর সবচেয়ে ভালো, আর শহর, ঐতিহাসিক স্থান ও হাওরের সড়ক ঘুরতে শীতকাল আরামদায়ক।
সাধারণ প্রশ্ন
শোলাকিয়া ঈদগাহ কোথায়?
শোলাকিয়া ঈদগাহ কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে। এখানে প্রতি ঈদে দেশের অন্যতম বড় জামাত হয়।
কিশোরগঞ্জের হাওর দেখতে কোথায় যাব?
নিকলী, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম হাওর ভ্রমণের জন্য জনপ্রিয়। বর্ষায় নিকলীর বেড়িবাঁধ থেকে নৌকায় হাওর ঘোরা যায়।
কিশোরগঞ্জের কোন খাবার চেখে দেখা উচিত?
হাওরের টাটকা মাছের ঝোল, নানা রকম শুঁটকির ভর্তা ও ভুনা এবং শীতের পিঠা এখানকার সবচেয়ে পরিচিত স্বাদ।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh