কুড়িগ্রাম জেলা: নদী যেখানে দেশে ঢোকে
রংপুর বিভাগ · ৯টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
বাংলাদেশের মানচিত্রে ব্রহ্মপুত্র নদ প্রথম যে জায়গা ছুঁয়ে দেশে ঢোকে, সেটি কুড়িগ্রামের ঝুনকারচর। এখান থেকেই বিশাল এই নদ দক্ষিণে নেমে গেছে, আর তার দুই পাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য চর, যেখানে মানুষ বালুর ওপর ঘর বাঁধে, বন্যায় সরে যায়, আবার ফিরে আসে। কুড়িগ্রাম জেলাকে বুঝতে হলে এই নদীকেই আগে বুঝতে হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম আর মেঘালয়ের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করা এই জেলা দেশের উত্তর-পূর্ব কোণে, যেখানে নদী একই সঙ্গে জীবিকা আর দুর্ভোগ দুটোরই উৎস।
ধরলা, তিস্তা আর নদীর জালে বোনা জেলা
কুড়িগ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ফুলকুমার, জিঞ্জিরাম ও জলঢাকাসহ বহু নদী। নদীর এই জালের কারণেই জেলার বড় একটা অংশ চরাঞ্চল, যেখানে যাতায়াত চলে নৌকায়। বর্ষায় প্রায় প্রতিবছর বন্যা হয়, ভাঙনে ভিটেমাটি হারায় অনেক পরিবার।
ব্রহ্মপুত্র জেলাটিকে কার্যত দুই ভাগ করে দিয়েছে। নদের পূর্ব পাড়ে রৌমারী আর চর রাজিবপুর উপজেলা, যেখানে জেলা সদর থেকে যেতে হলে নৌকায় বিশাল নদ পার হতে হয়। চরের মানুষ উঁচু ভিটায় ঘর তোলে, বর্ষায় গবাদিপশু নিয়ে বাঁধে বা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেয়, আর পানি নামলে আবার জমিতে ফেরে। চরের বালুমাটিতে ভুট্টা, মরিচ, বাদাম আর মিষ্টিকুমড়ার চাষ এখন অনেক পরিবারের আয়ের বড় উৎস।
জেলার অর্থনীতি প্রধানত কৃষিনির্ভর। ধান, গম, আলু, পাট, ভুট্টা আর তামাক এখানকার প্রধান ফসল। একসময় আশ্বিন-কার্তিকের অভাবের মৌসুম, যাকে উত্তরের মানুষ "মঙ্গা" বলে চিনত, কুড়িগ্রামের সঙ্গে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। কাজের সুযোগ আর নতুন ফসলের চাষ বাড়ায় সেই কষ্ট অনেকটা কমেছে, তবে নদীভাঙন এখনো এখানকার মানুষের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কুড়ি নামের কিংবদন্তি
কুড়িগ্রাম নামের উৎস নিয়ে নিশ্চিত কোনো দলিল নেই, তবে কয়েকটি গল্প প্রচলিত আছে। একটি গল্প বলে, কোচবিহারের মহারাজা বিশ্বসিংহ এই অঞ্চলে কুড়িটি জেলে পরিবারকে এনে বসতি গড়ে দিয়েছিলেন, সেখান থেকে নাম হয় কুড়িগ্রাম। আরেক মতে, কোচবিহার থেকে কুড়িটি কোচ পরিবার এখানে এসে বাস শুরু করে। আবার কারও কারও মতে, এখানে "কুড়ি" নামে একটি জনগোষ্ঠী বাস করত। কোন ব্যাখ্যাটি সত্য, তা বলা কঠিন, কিন্তু তিনটি গল্পই মনে করিয়ে দেয়, এই অঞ্চলের ইতিহাস কোচবিহার রাজ্যের সঙ্গে কতটা জড়িয়ে ছিল।
রাজা, কোম্পানি আর মহকুমা
মধ্যযুগে এই অঞ্চল কামরূপ ও পরে কোচ রাজাদের প্রভাবাধীন ছিল। রাজারহাটের চত্রা এলাকায় নীলধ্বজ, চক্রধ্বজ ও নীলাম্বর নামে রাজাদের রাজত্বের কথা স্থানীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়, যদিও এ বিষয়ে তথ্য খুব সীমিত। পরে মুঘলরা অঞ্চলটি দখল করে, এবং আরও পরে তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে আসে।
১৮৭৫ সালে কুড়িগ্রাম মহকুমা গঠিত হয়, তখন এটি ছিল বৃহত্তর রংপুর জেলার অংশ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কুড়িগ্রাম পৌরসভা হয়, আর ১৯৮৪ সালে মহকুমাটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয়।
একাত্তরের কুড়িগ্রাম
মুক্তিযুদ্ধে কুড়িগ্রামের একটি বিশেষ জায়গা আছে। ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব পাড়ের রৌমারী প্রায় পুরো যুদ্ধজুড়ে মুক্তাঞ্চল ছিল; সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শিবির চলত। অন্যদিকে জেলার নানা জায়গায় নির্মম হত্যাযজ্ঞও ঘটে। ১৩ নভেম্বর উলিপুরের হাতিয়া ইউনিয়নের দাগারকুঠিতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা কয়েকশো মানুষকে হত্যা করে, যা হাতিয়া গণহত্যা নামে পরিচিত। মে মাসে চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের তীরেও হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। নভেম্বরের শেষ দিকে ভুরুঙ্গামারী ও নাগেশ্বরী এলাকায় তীব্র লড়াই হয়; এই লড়াইয়ে শহীদ হন লেফটেন্যান্ট আশফাকুস সামাদ, যাঁকে বীর উত্তম খেতাব দেওয়া হয়। জেলায় বহু গণকবর ও বধ্যভূমি চিহ্নিত হয়েছে।
চিলমারী, ভাওয়াইয়া আর অষ্টমীর স্নান
কুড়িগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে আছে চিলমারী। ব্রহ্মপুত্রের তীরের এই পুরোনো নদীবন্দর একসময় ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র। ভাওয়াইয়া গানের গাড়িয়াল আর মাহুতের বিরহের গানে চিলমারী বন্দরের নাম বারবার ফিরে আসে; এসব গান উত্তরের মানুষের মুখে মুখে আজও বেঁচে আছে।
প্রতিবছর চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে অষ্টমী স্নান হয়। রংপুর বিভাগের নানা জেলা থেকে, এমনকি সীমান্তের ওপার থেকেও লাখো হিন্দু পুণ্যার্থী এখানে স্নান করতে আসেন। স্নানকে ঘিরে নদীর পাড়ে মেলা বসে, পরদিন কাছের বালাবাড়িহাটেও মেলা জমে।
ভাওয়াইয়ার প্রাণ দোতরা, আর এর সুরে টানা টানা গলার বাঁক, যা নদী আর খোলা মাঠের দূরত্ব পেরিয়ে যাওয়ার মতো করে গাওয়া হয়। কুড়িগ্রামের গ্রামীণ শিল্পীরা আজও হাটের দিনে, বিয়ের আসরে বা মেলার মঞ্চে এই গান গেয়ে শোনান, আর নতুন প্রজন্মের অনেকে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনে তা শিখছে।
ভাওয়াইয়া ছাড়াও এখানে পল্লিগীতি, মুর্শিদি, মারফতি, বাউল আর জারি গানের চর্চা আছে। ছড়া, ধাঁধা আর লোককাহিনিতেও নদী আর চরের জীবন বারবার ঘুরেফিরে আসে।
কুড়িগ্রামে কোথায় যাবেন
ধরলা সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা কুড়িগ্রাম শহরের মানুষের প্রিয় বিকেলের অভ্যাস। চিলমারীর রমনা ঘাট থেকে ব্রহ্মপুত্রে নৌকা ভ্রমণে চরের জীবন কাছ থেকে দেখা যায়। প্রাচীন চান্দামারী মসজিদ, রাজারহাটের সিঁদুরমতি দিঘি, ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গা জমিদারবাড়ি, নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ জমিদারবাড়ি আর ভুরুঙ্গামারীর সোনাহাট সেতু ইতিহাস ও প্রকৃতি দুটোরই স্বাদ দেয়। খোলা জলাভূমির শান্ত রূপ দেখতে চাইলে যেতে পারেন রাজারহাটের চাকির পশার বিলে।
চরের রান্না, সাদামাটা স্বাদ
কুড়িগ্রামের রান্না আড়ম্বরহীন, কিন্তু নদীর কারণে মাছের অভাব নেই। ধরলা আর ব্রহ্মপুত্রের টাটকা মাছ দিয়ে পাতলা মাছের ঝোল এখানে প্রায় প্রতিদিনের খাবার। উত্তরের অন্য জেলার মতো এখানেও আলুর প্রাচুর্য, তাই সরিষার তেল আর কাঁচা মরিচ মেখে আলু ভর্তা ছাড়া ভাতের থালা অসম্পূর্ণ মনে হয়। শীতকালে নতুন ধান উঠলে চালের গুঁড়ার ভাপা, চিতই আর তেলের পিঠার আয়োজন চলে ঘরে ঘরে। জেলার এসব খাবারের বিস্তারিত পাবেন কুড়িগ্রামের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
যাতায়াত ও উপযুক্ত সময়
ঢাকা থেকে সড়কপথে বাসে কুড়িগ্রাম যাওয়া যায়। রেলপথেও সরাসরি যোগাযোগ আছে; ২০১৯ সাল থেকে ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে "কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস" চলছে। আকাশপথে গেলে নিকটতম বিমানবন্দর নীলফামারীর সৈয়দপুর, সেখান থেকে সড়কপথে আসতে হয়। নদী ও চর ঘুরতে শীতকাল সবচেয়ে উপযুক্ত, আর অষ্টমী স্নান দেখতে চাইলে চৈত্র মাসে যেতে হবে। বর্ষায় নদী ভয়ংকর রূপ নেয়, তখন চরে যাওয়ার আগে স্থানীয় মাঝি বা প্রশাসনের কাছ থেকে নদীর অবস্থা জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। শহরে থাকার জন্য সাধারণ মানের হোটেল পাওয়া যায়।
সাধারণ প্রশ্ন
কুড়িগ্রাম নামের উৎপত্তি কী?
প্রচলিত আছে, কোচবিহারের রাজা এখানে কুড়িটি পরিবারকে বসতি গড়ে দিয়েছিলেন, সেখান থেকে নাম কুড়িগ্রাম। তবে এ নিয়ে নিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
চিলমারীর অষ্টমী স্নান কখন হয়?
প্রতিবছর চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতে ব্রহ্মপুত্রের তীরে এই স্নান হয়। স্নান ঘিরে নদীর পাড়ে মেলাও বসে।
কুড়িগ্রাম কবে জেলা হয়?
কুড়িগ্রাম মহকুমা গঠিত হয় ১৮৭৫ সালে, আর ১৯৮৪ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh