Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

মাদারীপুর জেলা: দক্ষিণের দ্বার, খেজুর রসের দেশ

ঢাকা বিভাগ · ৪টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. শাহ মাদারের নামে জনপদ
  2. চন্দ্রদ্বীপ থেকে মহকুমা, মহকুমা থেকে জেলা
  3. ফরায়েজী আন্দোলন ও বিপ্লবী সমিতি
  4. একাত্তরে মাদারীপুর
  5. নদী, চর আর কৃষি
  6. মাদারীপুরে যা দেখবেন
  7. রস, গুড় আর ক্ষীরের মিষ্টি
  8. যাতায়াত ও ভালো মৌসুম
  9. সাধারণ প্রশ্ন

শীতের ভোরে মাদারীপুরের কোনো গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটলে দেখা যাবে, কুয়াশার ভেতর গাছির কাঁধে বাঁকে ঝোলানো মাটির হাঁড়ি, তাতে টলটলে খেজুরের রস। এ জেলার নিজস্ব স্লোগানেও রস আর গুড়ের কথা আছে, সঙ্গে আছে মাদারীপুরকে দক্ষিণের দ্বার বলার গর্ব। পদ্মা আর আড়িয়াল খাঁর মাঝখানের এই জনপদ একসময় বড় নদীবন্দর ছিল, উনিশ শতকের কৃষক আন্দোলনের জন্মভূমি ছিল, আর আজ পদ্মা সেতুর কল্যাণে রাজধানীর একেবারে কাছের জেলা হয়ে উঠেছে।

শাহ মাদারের নামে জনপদ

মাদারীপুর নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক সুফি সাধকের স্মৃতি। প্রচলিত আছে, বহু শতাব্দী আগে হযরত বদরউদ্দিন শাহ মাদার নামে এক সাধক এই অঞ্চলে এসে ধর্মপ্রচার করেছিলেন, আর তাঁর নাম থেকেই জায়গার নাম হয় মাদারীপুর। জেলার কয়েকটি স্থানে তাঁর স্মৃতির সঙ্গে জড়িত দরগাহ বা আস্তানার কথা স্থানীয়ভাবে বলা হয়। সঠিক সময়কাল নিয়ে নিশ্চিত দলিল না থাকলেও নামের এই ব্যাখ্যাটি জেলাজুড়ে সর্বজনস্বীকৃত।

চন্দ্রদ্বীপ থেকে মহকুমা, মহকুমা থেকে জেলা

প্রাচীনকালে এ অঞ্চল দক্ষিণ বঙ্গের চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য ও আশপাশের আঞ্চলিক শাসকদের অধীন ছিল বলে মনে করা হয়। ব্রিটিশ আমলে ১৮৫৪ সালে মাদারীপুর মহকুমা গঠিত হয়, প্রথমে বাকেরগঞ্জ জেলার অধীনে। ১৮৭৩ সালে মহকুমাটি ফরিদপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়, আর ১৯৮৪ সালে মাদারীপুর পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।

ফরায়েজী আন্দোলন ও বিপ্লবী সমিতি

মাদারীপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় সম্ভবত ফরায়েজী আন্দোলন। ১৭৮১ সালে তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমার শামাইল গ্রামে জন্ম নেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। দীর্ঘদিন মক্কায় অবস্থানের পর দেশে ফিরে তিনি ধর্মীয় সংস্কারের যে আন্দোলন শুরু করেন, তা ধীরে ধীরে জমিদার ও নীলকরদের শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করার আন্দোলনে রূপ নেয়। পরে তাঁর ছেলে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনটি আরও বিস্তৃত হয়। প্রতিবেশী শরীয়তপুর জেলার নামকরণও হয়েছে তাঁর নামে।

বিশ শতকের গোড়ায় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনেও মাদারীপুরের নাম আসে। পূর্ণচন্দ্র দাসের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা মাদারীপুর সমিতি সে সময়ের পরিচিত বিপ্লবী সংগঠনগুলোর একটি ছিল।

একাত্তরে মাদারীপুর

মুক্তিযুদ্ধের সময় মাদারীপুরেও নির্যাতন আর প্রতিরোধ দুটিই দেখা গেছে। এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনারা স্থানীয় এক জেল কর্মকর্তাকে সপরিবারে হত্যা করে। রাজৈর উপজেলার সেন্দিয়া গ্রামে বহু মানুষকে হত্যা করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ডিসেম্বরের শুরুতে মাদারীপুর-টেকেরহাট সড়কের সমাদ্দার সেতুর কাছে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে কয়েক দিন ধরে লড়াই চলে, আর ১০ ডিসেম্বর মাদারীপুর শত্রুমুক্ত হয়। কলাগাছিয়া, বাহাদুরপুর ও মিঠাপুরে গণকবর রয়েছে।

নদী, চর আর কৃষি

মাদারীপুরের উত্তরে পদ্মা, আর জেলার মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে আড়িয়াল খাঁ। এর পাশাপাশি কুমার ও ঘাঘর নদী এবং মাদারীপুর বিল রুট নামে পরিচিত নৌপথ এ জেলার যোগাযোগের পুরোনো ভরসা। নদীর ভাঙন আর নতুন চর জাগা এখানকার মানুষের জীবনের চিরচেনা ছন্দ।

জীবিকার মূল ভিত্তি কৃষি। ধান, পাট, সরিষা আর আখ এখানকার প্রধান ফসল, আর শীতে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ বহু পরিবারের মৌসুমি আয়ের উৎস। পাটজাত পণ্য ও খেজুরের গুড় জেলার বাইরেও যায়। চরমুগরিয়া একসময় আড়িয়াল খাঁর তীরে বড় বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে নৌকা আর স্টিমারে করে পণ্য আসা-যাওয়া করত। পদ্মা সেতু চালুর পর শিবচরসহ জেলার উত্তরাংশে নতুন সড়ক আর বসতি দ্রুত গড়ে উঠছে।

আড়িয়াল খাঁ নদী মাদারীপুরের মানুষের কাছে শুধু পানির ধারা নয়, জীবনের অংশ। একসময় এই নদী দিয়ে স্টিমার আর লঞ্চে চড়ে মানুষ বরিশাল, খুলনা আর ঢাকার দিকে যাতায়াত করত, আর নদীর ঘাটগুলোকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল হাটবাজার। বর্ষায় নদী ফুলে উঠলে তীরের গ্রামগুলোতে ভাঙনের আতঙ্ক থাকে, আবার পানি নেমে গেলে জেগে ওঠা চরে কলাই, বাদাম আর সবজির চাষ শুরু হয়। শিবচরের পদ্মাপাড়ে একসময় ফেরিঘাট আর লঞ্চঘাটের যে ভিড় ছিল, পদ্মা সেতু চালুর পর তার জায়গা নিয়েছে নতুন সড়ক, বাজার আর আবাসন।

মাদারীপুরে যা দেখবেন

জেলা শহরের মাঝখানে শকুনি লেক মাদারীপুরের সবচেয়ে পরিচিত বিনোদনকেন্দ্র; বিকেলে লেকের পাড়ে হাঁটা শহরবাসীর প্রিয় অভ্যাস। চরমুগরিয়ার পুরোনো বন্দর এলাকায় এখনো দলে দলে বানর দেখা যায়, যারা প্রায় এক শতাব্দী ধরে এই এলাকায় মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান করছে বলে স্থানীয়রা বলেন; এখানে একটি ইকোপার্কও গড়ে তোলা হয়েছে। সদর উপজেলার আলগী কাজীবাড়ি মসজিদ পুরোনো স্থাপত্যের নিদর্শন। রাজৈর উপজেলার খালিয়ায় রাজারাম মন্দির টেরাকোটার কাজের জন্য পরিচিত, আর সেখানকার পুরোনো জমিদারবাড়িও দেখার মতো।

রস, গুড় আর ক্ষীরের মিষ্টি

মাদারীপুরের খাবারের কথা উঠলে প্রথমেই আসে খেজুরের রস। শীতের ভোরে গাছ থেকে নামানো ঠান্ডা কাঁচা রস খাওয়ার রেওয়াজ বহু পুরোনো, তবে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকির কারণে এখন অনেকেই রস জ্বাল দিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন। সেই রস দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় ঝোলা গুড়, দানাদার গুড় আর পাটালি। ভালো পাটালির রং হালকা বাদামি, ভাঙলে দানা দেখা যায়, আর গন্ধে মিশে থাকে রসের মিষ্টি ঘ্রাণ।

রস আর গুড় দিয়ে শীতজুড়ে চলে পিঠার আয়োজন। রসে ভেজানো চিতই পিঠা, যাকে অনেকে রসের পিঠা বলেন, ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা আর রসের পায়েস মাদারীপুরের ঘরে ঘরে তৈরি হয়। মিষ্টির দোকানে খোঁজ নিলে পাবেন ক্ষীরপুরি, ছানার স্তরের ওপর ঘন ক্ষীর ঢেলে তৈরি এক ধরনের হালকা মিষ্টি, যা শহরের পুরোনো মিষ্টির দোকানগুলোর নিজস্ব পরিচয় হয়ে উঠেছে। নদীর জেলায় পদ্মা আর আড়িয়াল খাঁর মাছও প্রতিদিনের খাবারে থাকে। গ্রামের দিকে শীতের সকালে অনেক বাড়িতে মুড়ি আর খই খাওয়া হয় নতুন গুড়ের সঙ্গে, আর অতিথি এলে পাটালি দিয়ে তৈরি নারকেলের নাড়ু সামনে রাখা হয়। মৌসুম শেষে কিছু গুড় সংরক্ষণ করে রাখা হয় সারা বছরের মিষ্টান্ন রান্নার জন্য। আরও বিস্তারিত পাবেন মাদারীপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাতায়াত ও ভালো মৌসুম

ঢাকা থেকে মাদারীপুর এখন সড়কপথে পদ্মা সেতু পার হয়ে খুব অল্প সময়ে পৌঁছানো যায়; বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িই সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যম। পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ লাইনও জেলার শিবচর এলাকা দিয়ে গেছে। খেজুরের রস আর পিঠার স্বাদ নিতে চাইলে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির শীতকাল সবচেয়ে উপযুক্ত সময়; বর্ষায় আড়িয়াল খাঁর ভরা রূপও দেখার মতো।

সাধারণ প্রশ্ন

মাদারীপুর নামটি কোথা থেকে এসেছে?

প্রচলিত আছে, সুফি সাধক হযরত বদরউদ্দিন শাহ মাদারের নামানুসারে মাদারীপুরের নামকরণ হয়েছে। তিনি এ অঞ্চলে ধর্মপ্রচার করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে।

হাজী শরীয়তুল্লাহর সঙ্গে মাদারীপুরের সম্পর্ক কী?

ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবর্তক হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৭৮১ সালে তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমার শামাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

মাদারীপুরে খেজুরের রস কখন পাওয়া যায়?

সাধারণত অগ্রহায়ণ থেকে মাঘ মাস, অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রস ও নতুন গুড়ের মৌসুম। নিরাপত্তার জন্য কাঁচা রসের বদলে জ্বাল দেওয়া রস খাওয়াই ভালো।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

মাদারীপুরের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ মাদারীপুরের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 ঢাকা বিভাগের অন্য জেলা