মৌলভীবাজার জেলা: চায়ের টিলা, বন আর হাওরের দেশ
সিলেট বিভাগ · ৭টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
একটা কাচের গ্লাসে সাতটা আলাদা রঙের স্তর, একটার সঙ্গে আরেকটা মেশে না—শ্রীমঙ্গলের সাত রঙের চা দেখে প্রথমবার অনেকেই বিশ্বাস করতে পারেন না যে এটা আসলেই চা। মৌলভীবাজার জেলা এমনই চমকে ভরা। দিগন্তজোড়া চা-বাগানের ঢেউ খেলানো টিলা, লাউয়াছড়ার ঘন বনে উল্লুকের ডাক, পাথরের দেয়াল বেয়ে নামা মাধবকুণ্ডের জলধারা, আর বর্ষায় সাগরের মতো হয়ে ওঠা হাকালুকি হাওর—সবই এই এক জেলায়। সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারকে অনেকে দেশের চায়ের রাজধানী বলেন, আর সেটা অতিরঞ্জন নয়।
মনু নদীর তীরে মৌলভীর বাজার
জেলার নামটি নিজেই একটা গল্প বলে। প্রচলিত আছে, আঠারো শতকের মাঝামাঝি হযরত শাহ মোস্তফার বংশধর মৌলভী সৈয়দ কুদরতউল্লাহ মনু নদীর উত্তর তীরে কয়েকটি দোকানঘর বসিয়ে একটি বাজারের পত্তন করেন। নদীপথ আর স্থলপথে লোকজন আসতে থাকায় বাজারটি দ্রুত জমে ওঠে, আর মৌলভী সাহেবের বাজার থেকেই জায়গার নাম হয় মৌলভীবাজার। শহরে হযরত শাহ মোস্তফার মাজার এখনো মানুষের শ্রদ্ধার জায়গা। মনু নদী আজও শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যায়; বর্ষায় এর পানি বাড়লে শহরবাসীর দুশ্চিন্তাও বাড়ে, তাই নদীর তীর ঘেঁষে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। সেই বাঁধের ওপর বিকেলে হাঁটা শহরের মানুষের পুরোনো অভ্যাস।
বাজার থেকে জেলা
দীর্ঘকাল এই অঞ্চল বৃহত্তর সিলেটের অংশ ছিল, যার ইতিহাস চৌদ্দ শতকে শাহজালালের আগমন, পরে মোগল ও ব্রিটিশ শাসনের ধারায় বাঁধা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ব্রিটিশরা সিলেট অঞ্চলে চা চাষ শুরু করলে মৌলভীবাজারের টিলাভূমি দ্রুত চা-বাগানে ছেয়ে যায়। বাগানে কাজের জন্য তখন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শ্রমিক আনা হয়েছিল, যাঁদের উত্তরসূরিরা আজও বাগানের লাইনে বাস করেন, নিজেদের ভাষা ও উৎসব নিয়ে। ১৯৮৪ সালে মৌলভীবাজার পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজার ছিল ৪ নম্বর সেক্টরের অধীনে। মার্চের শেষেই শহরে প্রতিবাদী মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে মানুষ নিহত হলে প্রতিরোধ শুরু হয়। ডিসেম্বরের শুরুতে বিভিন্ন চা-বাগান ও সীমান্ত এলাকায় তীব্র লড়াই হয়। কমলগঞ্জের ধলাই সীমান্ত এলাকার যুদ্ধে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান, যাঁর স্মরণে সেখানে স্মৃতিসৌধ গড়া হয়েছে।
টিলা, বন আর হাওর
মৌলভীবাজারের ভূপ্রকৃতি তিন ভাগে বোঝা যায়। দক্ষিণ ও পূর্বে ত্রিপুরা ও আসাম সীমান্ত ঘেঁষে টিলা আর চা-বাগান; তার ফাঁকে ফাঁকে লাউয়াছড়ার মতো মিশ্র চিরসবুজ বন। উত্তর ও পশ্চিমে নিচু হাওর আর বিল—হাকালুকি, হাইল হাওর আর কাউয়াদিঘি। আর এগুলোর মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে মনু, ধলাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদী।
বড়লেখা, কুলাউড়া, জুড়ী আর সিলেট জেলার কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত হাকালুকিকে দেশের সবচেয়ে বড় হাওর বলা হয়; শত শত ছোট-বড় বিল বর্ষায় মিশে এক বিশাল জলাশয় হয়ে যায়। শীতে এখানে পরিযায়ী পাখির ভিড় জমে।
চা-বাগানের ভেতরে ঢুকলে একটা আলাদা জগৎ চোখে পড়ে। সারি সারি ছাঁটা চা-গাছের মাঝে মাঝে ছায়াবৃক্ষ, পিঠে ঝুড়ি নিয়ে পাতা তুলছেন নারী শ্রমিকেরা, টিলার মাথায় পুরোনো ব্রিটিশ আমলের বাংলো, আর নিচে কারখানা থেকে ভেসে আসছে শুকানো পাতার ঘ্রাণ। চা তোলার মৌসুম মূলত বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত; শীতে গাছ ছাঁটা হয়।
অর্থনীতির বড় স্তম্ভ চা আর রাবার। শ্রীমঙ্গলে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট অবস্থিত। টিলার ঢালে আনারস, লেবু আর পান চাষ হয়, হাওরে ধান আর মাছ। প্রবাসী আয়ও জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আর পর্যটন দিন দিন বাড়ছে।
মণিপুরি তাঁত, খাসিয়া পুঞ্জি
মৌলভীবাজারের সংস্কৃতি বহুবর্ণ। কমলগঞ্জের আদমপুর ও মাধবপুর অঞ্চলে মণিপুরি সম্প্রদায়ের বসতি; তাঁদের রাসলীলা উৎসব কার্তিক পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়, যখন সারা রাত ধরে মণিপুরি নৃত্য আর কীর্তন চলে। মণিপুরি নারীদের হাতে বোনা তাঁতের শাড়ি, চাদর আর শাল এখানকার পরিচিত কারুপণ্য। টিলার ওপর খাসিয়া পুঞ্জিগুলোতে পান চাষই জীবিকা, আর গারো ও চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসবও আছে।
লোকগানেও এই অঞ্চল পিছিয়ে নেই। সিলেট অঞ্চলের ধামাইল, বাউল আর মরমি গান বিয়ে-শাদি ও উৎসবে গাওয়া হয়, আর চা-বাগানের শ্রমিকদের ঝুমুর নাচ-গান বাগানের উৎসবে প্রাণ আনে।
যেখানে যেতেই হবে
শ্রীমঙ্গলের কাছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান জেলার সবচেয়ে বিখ্যাত গন্তব্য; বনের বুক চিরে চলে যাওয়া রেললাইন, উল্লুক আর নানা পাখির জন্য পরিচিত। বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত দেশের সবচেয়ে পরিচিত জলপ্রপাতগুলোর একটি, কাছেই পরিকুণ্ড। শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের বাইক্কা বিল একটি সংরক্ষিত জলাভূমি, যেখানে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে শীতের পাখি দেখা যায়। আর জেলাজুড়ে অসংখ্য চা-বাগান, তার মধ্যে কোনোটির ভেতর দিয়ে হেঁটে বা গাড়িতে ঘোরার অভিজ্ঞতা আলাদা। কমলগঞ্জের মাধবপুর লেকও টিলার মাঝে এক শান্ত জায়গা।
চায়ের কাপে মৌলভীবাজার
মৌলভীবাজারের খাবারের গল্প চা ছাড়া শুরুই হয় না। শ্রীমঙ্গলের নীলকণ্ঠ টি কেবিনের রমেশ রাম গৌড় সাত রঙের চায়ের উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত। আলাদা ঘনত্বের চা, দুধ আর মসলার স্তর সাজিয়ে তৈরি এই চায়ের প্রতিটি স্তরের স্বাদ আলাদা, আর রেসিপিটি তিনি গোপন রাখেন। সাধারণ দুধ চা অবশ্য এখানকার প্রতিটি মোড়ের দোকানের দৈনন্দিন সঙ্গী, তাতে বাগানের টাটকা পাতার ঘ্রাণ।
শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের টিলায় ফলানো আনারসও দেশজুড়ে পরিচিত; মৌসুমে রাস্তার পাশে স্তূপ করে বিক্রি হতে দেখা যায়, মিষ্টি আর রসালো। হাওরের মাছ আর সিলেটি রান্নার ধারায় সাতকরা দিয়ে মাংসও এখানে জনপ্রিয়। আরও জানতে দেখুন মৌলভীবাজারের বিখ্যাত খাবার।
জেলার চা-বাগানের শ্রমিক পরিবার আর মণিপুরি ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের রান্নাঘরেও আলাদা স্বাদ মেলে। মণিপুরি রান্নায় শুঁটকি আর নানা ধরনের শাকের ব্যবহার বেশি, খাসিয়া পুঞ্জিতে পানের পাশাপাশি নিজেদের বাগানের সবজি পাতে আসে। হাওরের দিকে গেলে আবার বোয়াল, আইড় আর ছোট মাছের ঝোল, শীতে হাঁসের মাংস। শ্রীমঙ্গল শহরে এখন অনেক রিসোর্ট আর রেস্তোরাঁ হয়েছে, তবে স্থানীয় স্বাদ পেতে বাজারের ছোট ভাতের হোটেলই ভালো ঠিকানা।
কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন
ঢাকা থেকে মৌলভীবাজার সড়কপথে বাসে যাওয়া যায়। রেলপথে ঢাকা-সিলেট লাইনের শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া স্টেশনে নেমে জেলার বিভিন্ন অংশে যাওয়া সুবিধাজনক। বন আর চা-বাগান বর্ষায় সবচেয়ে সবুজ, জলপ্রপাতেও তখন পানি বেশি থাকে; হাওরে পাখি দেখতে শীতকাল সেরা।
সাধারণ প্রশ্ন
মৌলভীবাজার নাম কীভাবে হলো?
প্রচলিত আছে, আঠারো শতকে মৌলভী সৈয়দ কুদরতউল্লাহ মনু নদীর তীরে একটি বাজার গড়ে তোলেন। সেই মৌলভীর বাজার থেকেই জায়গার নাম হয় মৌলভীবাজার।
সাত রঙের চা কোথায় পাওয়া যায়?
শ্রীমঙ্গলের নীলকণ্ঠ টি কেবিনে সাত রঙের চা পাওয়া যায়, যার উদ্ভাবক হিসেবে রমেশ রাম গৌড় পরিচিত। শ্রীমঙ্গলের আরও কিছু দোকানেও এখন বহুস্তরের চা বিক্রি হয়।
মৌলভীবাজারের দর্শনীয় স্থান কোনগুলো?
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর, বাইক্কা বিল আর শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান সবচেয়ে জনপ্রিয়।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh