Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

নওগাঁ জেলা: পাহাড়পুরের ছায়ায় ধান আর আমের দেশ

রাজশাহী বিভাগ · ১১টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. ‘নও গাঁ’ মানে নতুন গ্রাম
  2. পাল রাজাদের বিহার থেকে কৈবর্ত বিদ্রোহ
  3. আত্রাই, চলনবিল আর বরেন্দ্রের লাল মাটি
  4. পতিসরে রবীন্দ্রনাথ, মাঠে নবান্ন
  5. যেসব জায়গা না দেখলেই নয়
  6. প্যারা সন্দেশ, আম আর পিঠার মৌসুম
  7. ঢাকা থেকে নওগাঁ
  8. সাধারণ প্রশ্ন

সমতল খেতের মাঝখানে হঠাৎ মাটির একটি উঁচু ঢিবি, যাকে আশপাশের গ্রামের মানুষ বহু শতাব্দী ধরে ‘পাহাড়’ বলে ডেকেছে। সেই ঢিবির নিচেই চাপা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম বড় বৌদ্ধবিহার। নওগাঁ জেলার পরিচয় তাই শুরু হয় পাহাড়পুর দিয়ে, কিন্তু সেখানে থামে না। বরেন্দ্রের লাল মাটির এই জেলা দেশের ধানের অন্যতম বড় ভান্ডার, আমের নতুন রাজধানী, আর এক সময়ের বিখ্যাত গাঁজা চাষের এলাকা। আত্রাই নদীর পাড়ে শহরের মিষ্টির দোকানে পাওয়া যায় প্যারা সন্দেশ, যার স্বাদ নওগাঁর বাইরে গিয়েও মানুষ মনে রাখে।

‘নও গাঁ’ মানে নতুন গ্রাম

নওগাঁ নামের ব্যাখ্যা বেশ সরল। ফারসি ‘নও’ অর্থ নতুন, আর বাংলা ‘গাঁ’ অর্থ গ্রাম; দুটো মিলে নতুন গ্রাম। ধারণা করা হয়, আত্রাই নদীর তীরে গড়ে ওঠা একটি নতুন বসতি ধীরে ধীরে বাজার, শহর এবং শেষে জেলার কেন্দ্রে পরিণত হয়, আর নামটিও সেভাবেই টিকে যায়।

পাল রাজাদের বিহার থেকে কৈবর্ত বিদ্রোহ

নওগাঁ প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন ও বরেন্দ্র ভূমির অংশ। অষ্টম শতকের শেষ দিকে পাল রাজা ধর্মপাল বদলগাছী উপজেলায় সোমপুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নামে পরিচিত। প্রায় দেড় শতাধিক ভিক্ষুকক্ষ ঘেরা বর্গাকার চত্বরের মাঝখানে কয়েক ধাপে উঠে যাওয়া কেন্দ্রীয় মন্দিরের দেয়ালে পোড়ামাটির ফলকে আঁকা আছে সেকালের মানুষ, পশুপাখি আর লোককাহিনি। ১৯৮৫ সালে ইউনেসকো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় তোলে। জেলার হলুদ বিহার আর জগদ্দল বিহারও পাল আমলের বৌদ্ধ শিক্ষার সাক্ষী।

পত্নীতলার দিবর দীঘির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি অষ্টভুজ গ্রানাইট স্তম্ভ। এতে কোনো লিপি নেই, তবে ইতিহাসবিদদের ধারণা, এটি একাদশ শতকে পাল রাজার বিরুদ্ধে কৈবর্ত নেতা দিব্যকের বিজয়ের স্মারক। বাংলার ইতিহাসে কৈবর্ত বিদ্রোহ সাধারণ মানুষের অন্যতম প্রথম বড় বিদ্রোহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সুলতানি আমলের শেষ ভাগে, ১৫৫৮ সালে মান্দা উপজেলায় আত্রাইয়ের তীরে নির্মিত হয় কুসুম্বা মসজিদ। কালো পাথরে মোড়া এই মসজিদের মিহরাবে আঙুরলতা আর কলসের নকশা খোদাই করা। ব্রিটিশ আমলে নওগাঁ ছিল রাজশাহী জেলার মহকুমা; ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এটি পৃথক জেলা হয়।

ব্রিটিশ আমলে নওগাঁর এক অদ্ভুত পরিচয় ছিল গাঁজা চাষ। সরকারি নিয়ন্ত্রণে এখানে বাণিজ্যিকভাবে গাঁজার চাষ হতো, আর ১৯১৭ সালে চাষিদের নিয়ে গড়ে ওঠে গাঁজা চাষি সমবায় সমিতি। সেই সমিতির আয় থেকে শহরের স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ-মন্দির গড়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার পরে আন্তর্জাতিক চুক্তির ধারাবাহিকতায় গাঁজা চাষ বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু শহরের ‘গাঁজা মহাল’ নামটি এখনো টিকে আছে।

মুক্তিযুদ্ধে নওগাঁয় ইপিআরের একটি উইংয়ের সদর দপ্তর ছিল, যা শুরুর প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী শহর দখল করে এবং পরের মাসগুলোতে রাণীনগর, মান্দাসহ নানা জায়গায় গণহত্যা চালায়। জেলায় বহু গণকবর শনাক্ত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ামতপুর থানাসহ কয়েক জায়গায় সফল আক্রমণ চালান।

আত্রাই, চলনবিল আর বরেন্দ্রের লাল মাটি

নওগাঁর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে আত্রাই, পুনর্ভবা, ছোট যমুনা, নাগর আর শিব নদী। জেলার দক্ষিণ-পূর্বে আত্রাই ও রাণীনগরের দিকে নিচু জমি, চলনবিলের ছোঁয়া; আর পশ্চিমে সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুরের দিকে উঁচু বরেন্দ্র ভূমির লালচে মাটি। জেলার মানুষের বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান উৎপাদনে নওগাঁ দেশের শীর্ষ জেলাগুলোর একটি, চালকল আর চাতালের সংখ্যাতেও এগিয়ে। গত কয়েক দশকে বরেন্দ্রের শুকনা জমিতে আমবাগান ছড়িয়ে পড়েছে এত দ্রুত যে নওগাঁ এখন আম উৎপাদনেও প্রথম সারিতে। গ্রামের নারীরা টুপি বোনার কাজ করেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি হয়।

ধান কাটার মৌসুমে নওগাঁ শহরের আশপাশে চাতালের দৃশ্য দেখার মতো। বিশাল খোলা উঠোনে সেদ্ধ ধান রোদে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, শ্রমিকেরা পা দিয়ে আর কাঠের লাঙলের মতো যন্ত্রে বারবার উল্টে দেন, যাতে সমানভাবে শুকায়। তারপর সেই ধান যায় চালকলে, সেখান থেকে বস্তায় ভরে ট্রাকে দেশের নানা প্রান্তে।

পতিসরে রবীন্দ্রনাথ, মাঠে নবান্ন

আত্রাই উপজেলার পতিসরে ছিল ঠাকুর পরিবারের জমিদারির কাছারিবাড়ি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি দেখতে এখানে এসেছেন, নদীপথে বোটে থেকেছেন, কৃষকদের জন্য কৃষি ব্যাংক ও স্কুলের উদ্যোগ নিয়েছেন। কাছারিবাড়িটি এখন জাদুঘর।

নওগাঁর গ্রামীণ জীবনে পহেলা বৈশাখ, চড়কপূজা, নবান্ন আর হালখাতার উৎসব বড় জায়গা নিয়ে আছে। বর্ষায় আত্রাইয়ে নৌকাবাইচ আর গ্রামে লাঠিখেলার আয়োজন হয়। বরেন্দ্র অঞ্চলে সাঁওতাল ও ওরাওঁ সম্প্রদায়ের মানুষের বসতি আছে। ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র নাম এই অঞ্চলের প্রত্নচর্চার সঙ্গে জড়িয়ে আছে; তাঁদের গড়া বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি বিশ শতকের বিশের দশকে পাহাড়পুরের খননকাজে যুক্ত ছিল।

যেসব জায়গা না দেখলেই নয়

নওগাঁ ঘুরতে গেলে প্রথম গন্তব্য বদলগাছীর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ও তার জাদুঘর। মান্দার কুসুম্বা মসজিদ ছোট হলেও কারুকাজে মুগ্ধ করে। পত্নীতলার দিবর দীঘির পানির মাঝে দাঁড়ানো কৈবর্ত স্তম্ভ এক অদ্ভুত নির্জন অনুভূতি দেয়। ধামইরহাটের আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানে শালবনের মাঝে বিশাল দীঘি, আর পতিসরের রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য। শীতে রক্তদহ বিলে পরিযায়ী পাখি আসে।

প্যারা সন্দেশ, আম আর পিঠার মৌসুম

নওগাঁর মিষ্টির নাম বললে প্রথমে আসে প্যারা সন্দেশ। ঘন জ্বাল দেওয়া দুধের ক্ষীর আর চিনি দিয়ে হাতে গোল করে চ্যাপ্টা করা এই সন্দেশ দেখতে সাদামাটা, কিন্তু মুখে দিলে দানাদার ক্ষীরের মিষ্টতা অনেকক্ষণ থাকে। শহরের পুরোনো মিষ্টির দোকানগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই সন্দেশের সুনাম ধরে রেখেছে, অন্য মিষ্টির চেয়ে দাম একটু বেশি হলেও বিক্রিতে কমতি নেই।

গ্রীষ্মে সাপাহার আর পোরশার আমের হাটে ভোর থেকে ঝুড়ি আর ভ্যানের ভিড়, সেখান থেকে আম যায় সারা দেশে। আর শীতে নতুন ধান উঠলে ঘরে ঘরে পিঠার আয়োজন; চালের দেশ বলে নওগাঁর পিঠার বৈচিত্র্যও কম নয়। ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা আর দুধপিঠা নবান্নের দিনগুলোকে আলাদা করে তোলে। শীতের সকালে শহরের মোড়ে মোড়ে মাটির চুলায় ভাপা পিঠা বিক্রি হয়, গরম ধোঁয়া ওঠা পিঠার ভেতরে খেজুর গুড় আর নারকেলের পুর। আরও জানতে দেখুন নওগাঁর বিখ্যাত খাবার।

ঢাকা থেকে নওগাঁ

ঢাকা থেকে নওগাঁ সাধারণত সড়কপথে যাওয়া হয়, যমুনা সেতু পার হয়ে বগুড়া বা নাটোর হয়ে। রেলে গেলে সান্তাহার জংশন পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে নওগাঁ শহরে যাওয়া যায়। পাহাড়পুর আর প্রত্নস্থল ঘোরার জন্য শীতকাল সেরা; আর আম খেতে চাইলে জুন-জুলাইয়ে যান।

সাধারণ প্রশ্ন

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার কোন জেলায়?

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায়। অষ্টম শতকে পাল রাজা ধর্মপাল এটি প্রতিষ্ঠা করেন, ১৯৮৫ সালে এটি বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়।

নওগাঁ নামের অর্থ কী?

‘নও’ মানে নতুন আর ‘গাঁ’ মানে গ্রাম, অর্থাৎ নতুন গ্রাম। আত্রাইয়ের তীরের একটি নতুন বসতি থেকে নামটি এসেছে বলে ধরা হয়।

নওগাঁর বিখ্যাত মিষ্টি কোনটি?

নওগাঁর সবচেয়ে পরিচিত মিষ্টি প্যারা সন্দেশ, যা ঘন ক্ষীর আর চিনি দিয়ে তৈরি। গ্রীষ্মে এখানকার আমও সারা দেশে যায়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

নওগাঁয়ের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ নওগাঁয়ের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রাজশাহী বিভাগের অন্য জেলা