Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

নাটোর জেলা: রাজবাড়ির শহর, বিলের দেশ

রাজশাহী বিভাগ · ৬টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. রাজবংশের জন্ম ও অর্ধবঙ্গেশ্বরী
  2. একাত্তরের নাটোর
  3. চলনবিল, পদ্মা আর বড়াল
  4. জ্ঞানী মানুষ আর লোকজ উৎসব
  5. রাজবাড়ি থেকে বিলের ঘাট
  6. কাঁচাগোল্লার শহরে খাওয়াদাওয়া
  7. যাওয়ার পথ ও সময়
  8. সাধারণ প্রশ্ন

“নাটোরের বনলতা সেন”, জীবনানন্দ দাশের এই তিনটি শব্দ বাংলা ভাষার পাঠকের মনে নাটোরকে এক রহস্যময় নাম করে রেখেছে। কবিতার বাইরে আসল নাটোর অবশ্য অনেক বেশি মাটির কাছের। এখানে আছে রানী ভবানীর রাজবাড়ির পুকুর আর পুরোনো দালান, দিঘাপতিয়ার সবুজ চত্বরে উত্তরা গণভবন, বর্ষায় সমুদ্রের মতো ছড়িয়ে পড়া চলনবিল, আর লালবাজারের দোকানে মাটির হাঁড়িতে রাখা কাঁচাগোল্লা। রাজশাহী বিভাগের নাটোর জেলা ছোট, কিন্তু তার গল্পের ওজন অনেক।

রাজবংশের জন্ম ও অর্ধবঙ্গেশ্বরী

নাটোর নামের উৎস নিয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে স্থির কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, স্থানীয়ভাবে নানা মত শোনা যায়। তবে শহরের ইতিহাস যে নাটোর রাজবংশের সঙ্গে বাঁধা, তা নিয়ে সংশয় নেই। প্রাচীন কালে এলাকাটি ছিল পুণ্ড্রবর্ধনের অংশ, পরে পাল ও সেন শাসনের অধীনে। অষ্টাদশ শতকের গোড়ায় মুর্শিদকুলী খাঁর আমলে রামজীবন রায় এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমিদারি লাভ করেন, আর তাঁর হাতেই নাটোর রাজবংশের সূচনা।

এই বংশের সবচেয়ে পরিচিত নাম রানী ভবানী। স্বামী রামকান্তের মৃত্যুর পর অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি তিনি জমিদারির হাল ধরেন। তাঁর জমিদারি তখন উত্তরবঙ্গের বড় অংশ থেকে শুরু করে আজকের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ-মালদহ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে বলা হয়, সেই কারণে তাঁকে অর্ধবঙ্গেশ্বরী ডাকা হতো। দানশীলতা, মন্দির-পুকুর নির্মাণ আর প্রজাহিতৈষী কাজের জন্য লোকস্মৃতিতে তিনি এখনো উজ্জ্বল।

রানী ভবানীর দেওয়ান দয়ারাম রায় পুরস্কার হিসেবে দিঘাপতিয়া এলাকা পান, সেখানে গড়ে ওঠে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি। স্বাধীনতার পর সেই রাজবাড়ির নাম হয় উত্তরা গণভবন, যা উত্তরবঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ব্রিটিশ আমলের শুরুতে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার সদর দপ্তর ছিল নাটোরে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় পরে দপ্তর সরে যায় পদ্মার তীরে, আজকের রাজশাহী শহরে। ১৮৪৫ সালে নাটোর মহকুমা হয়, আর ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলা। ১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহের ঢেউ এখানেও লেগেছিল, আর ১৮৯৭ সালে নাটোরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলন হয়।

একাত্তরের নাটোর

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ নাটোর সদরে প্রতিরোধযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে লড়াই করেন। লালপুর উপজেলায় যুদ্ধ আর গণহত্যা দুই-ই হয়েছে ব্যাপক মাত্রায়। ৫ মে লালপুরের গোপালপুরে নর্থ বেঙ্গল চিনিকলের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনী মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বহু মানুষকে হত্যা করে; সেই পুকুর এখন শহীদ সাগর নামে স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে আছে। জেলায় একাধিক গণকবর শনাক্ত হয়েছে।

চলনবিল, পদ্মা আর বড়াল

নাটোরের ভূগোল বুঝতে হলে চলনবিলে যেতে হবে। সিংড়া, গুরুদাসপুর আর বড়াইগ্রাম উপজেলাজুড়ে এই বিশাল জলাভূমি বর্ষায় দিগন্ত পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকে, গ্রামগুলো দ্বীপের মতো ভাসে। শুকনো মৌসুমে সেই একই জমিতে বোরো ধান আর সরিষার খেত। দক্ষিণে লালপুর ঘেঁষে বয়ে গেছে পদ্মা; বড়াল, নারদ, গুড় আর নাগর নদীও জেলার জলধারা। হালতি বিলও স্থানীয়দের প্রিয় জায়গা, বর্ষায় সেখানে নৌকায় ঘোরার ভিড় লাগে।

চলনবিলের মানুষের জীবন চলে পানির ছন্দে। বর্ষায় ঘর থেকে হাট, স্কুল কিংবা আত্মীয়বাড়ি, সবখানে যেতে হয় নৌকায়। জেলেরা রাতভর জাল ফেলেন, ভোরে ঘাটে মাছের ছোট হাট বসে। পানি নামার পর কাদামাটিতে রোপণ হয় বোরো ধান, আর বিলের কিনারায় হাঁসের পাল চরে বেড়ায়। শীতে এই বিলে পরিযায়ী পাখিও আসে, যা দেখতে পাখিপ্রেমীরা দূর থেকে আসেন।

জেলার অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। ধান, আখ, গম, ডাল আর সবজির পাশাপাশি চলনবিলের মাছ নাটোরের বড় সম্পদ। শুকনো মৌসুমে বিলের পাড়ে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি হয়। লালপুর আর গোপালপুরের চিনিকল একসময় জেলার শিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল।

জ্ঞানী মানুষ আর লোকজ উৎসব

নাটোরের মাটি থেকে উঠে এসেছেন ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকার, যাঁর মুঘল ইতিহাস নিয়ে গবেষণা উপমহাদেশে পথিকৃৎ। সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশীও এই জেলার সন্তান। বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন শরৎকুমার রায় ছিলেন দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের সদস্য। জেলার আদিবাসী সম্প্রদায়ের কারাম ও সোহরাই উৎসব, ফাগুয়ার রং আর ফসল তোলার আনন্দ নাটোরের সংস্কৃতিকে বৈচিত্র্য দেয়।

রাজবাড়ি থেকে বিলের ঘাট

নাটোর শহরে রানী ভবানীর রাজবাড়ি চত্বরে বড় তরফ আর ছোট তরফের প্রাসাদ, মন্দির আর পুকুর ঘুরে দেখা যায়। শহরের উত্তরে উত্তরা গণভবনের ফটক, ঘড়ি টাওয়ার আর বাগান নিয়মিত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। পরিখা আর উঁচু প্রাচীরে ঘেরা এই রাজবাড়ির ভেতরে মূল প্রাসাদসহ কয়েকটি পুরোনো ভবন, পুকুর আর দেশি-বিদেশি গাছে ভরা বাগান; ভেতরের একটি অংশে রাজপরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে সংগ্রহশালাও আছে। সিংড়ায় চলনবিল জাদুঘর বিলের মানুষের জীবনযাত্রার নানা উপকরণ ধরে রেখেছে। বর্ষায় হালতি বিল আর চলনবিলে নৌকা ভ্রমণ, আর লালপুরের শহীদ সাগর স্মৃতিস্থান ইতিহাসের এক ভারী অধ্যায়ের কথা বলে।

কাঁচাগোল্লার শহরে খাওয়াদাওয়া

নাটোরের খাবারের গল্প শুরু হয় এক দুর্ঘটনা দিয়ে। প্রচলিত আছে, আঠারো শতকের মাঝামাঝি লালবাজারের মিষ্টির দোকানি মধুসূদন পালের দোকানে একদিন কারিগর আসেননি। জমানো ছানা নষ্ট হয়ে যাবে দেখে তিনি সেটা চিনির রসে জ্বাল দিয়ে নামিয়ে ফেলেন। ফলাফল এত সুস্বাদু হলো যে নাম দেওয়া হলো কাঁচাগোল্লা। এটা গোল রসগোল্লা নয়, বরং ঝুরঝুরে, হালকা এলাচ-ঘ্রাণের ছানার মিষ্টি। বলা হয়, রানী ভবানীর প্রিয় মিষ্টির তালিকাতেও এটি ছিল। ২০২৩ সালে নাটোরের কাঁচাগোল্লা ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পায়।

মিষ্টির বাইরে নাটোরের রোজকার খাবারে চলনবিলের মাছের ঝোলের জায়গা সবচেয়ে বড়। কই, শিং, টাকি, বোয়াল আর পুঁটির ঝোল পাতলা করে রাঁধা হয়, ওপরে কাঁচা মরিচ আর ধনেপাতা। শীতে বিলপাড়ের মাচায় শুকানো পুঁটি আর টাকির শুঁটকি দিয়ে ভর্তা বা ভুনা খাওয়ার চল আছে। শুঁটকি হালকা ভেজে রসুন, শুকনা মরিচ আর পেঁয়াজের সঙ্গে শিলপাটায় বেটে নেওয়া ভর্তা গরম ভাতের সঙ্গে এখানকার অনেক পরিবারের প্রিয়। শুকনো মৌসুমে বিলপাড়ের গ্রামে বাঁশের মাচায় সারি সারি মাছ শুকানোর দৃশ্যও চোখে পড়ে। এসব নিয়ে আরও পড়ুন নাটোরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাওয়ার পথ ও সময়

ঢাকা থেকে নাটোর সড়কপথে যমুনা সেতু পার হয়ে সরাসরি যাওয়া যায়, এটিই সবচেয়ে প্রচলিত। রেলপথেও যাওয়া যায়, রাজশাহীগামী ট্রেনগুলো নাটোর স্টেশন হয়ে যায়। চলনবিলের আসল রূপ দেখতে হলে বর্ষার শেষ, অর্থাৎ আগস্ট থেকে অক্টোবর ভালো সময়; আর রাজবাড়ি ও গণভবন ঘুরতে শীতকাল আরামদায়ক।

সাধারণ প্রশ্ন

নাটোর কেন রানী ভবানীর জন্য বিখ্যাত?

রানী ভবানী অষ্টাদশ শতকে নাটোর রাজবংশের বিশাল জমিদারি পরিচালনা করেন, যা উত্তরবঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁর রাজবাড়ি এখনো নাটোর শহরে দাঁড়িয়ে আছে।

উত্তরা গণভবন কী?

উত্তরা গণভবন হলো দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি, যা স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় ভবন হিসেবে নতুন নাম পায়। এটি নাটোর শহরের কাছে অবস্থিত।

কাঁচাগোল্লা কীভাবে তৈরি হয়?

ছানা চিনির রসে জ্বাল দিয়ে ঝুরঝুরে করে কাঁচাগোল্লা তৈরি হয়, সঙ্গে এলাচের ঘ্রাণ। প্রচলিত আছে, আঠারো শতকে মধুসূদন পালের দোকানে ঘটনাচক্রে এর জন্ম।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

নাটোরের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ নাটোরের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রাজশাহী বিভাগের অন্য জেলা