Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

নেত্রকোণা জেলা: হাওর আর পাহাড়ের মাঝের জনপদ

ময়মনসিংহ বিভাগ · ১০টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. হাওর থেকে পাহাড়: জেলার ভূপ্রকৃতি
  2. নামের রহস্য
  3. অতীতের পথ ধরে
  4. বাউল, গাহেন আর কবিতার মাটি
  5. যা দেখবেন
  6. বালিশ, শুঁটকি আর হাওরের মাছ
  7. যাতায়াত ও ভালো সময়
  8. সাধারণ প্রশ্ন

একটা মিষ্টির নাম বালিশ, আর সেটা এতই বড় যে একটাতেই কয়েকজনের পেট ভরে যায়। নেত্রকোণার নাম শুনলে অনেকের মাথায় প্রথম এই ছবিটাই আসে। কিন্তু জেলাটা তার চেয়ে অনেক বড় গল্পের জায়গা। উত্তরে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নামা সোমেশ্বরীর স্বচ্ছ জল, দক্ষিণ-পূর্বে খালিয়াজুরী আর মোহনগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর, মাঝখানে কৃষকের মাঠ আর বাউলের আসর। ময়মনসিংহ বিভাগের এই জেলা লোকগান, সাহিত্য আর আদিবাসী সংস্কৃতির এক মিলনভূমি।

হাওর থেকে পাহাড়: জেলার ভূপ্রকৃতি

নেত্রকোণার মানচিত্র দেখলে দুটো আলাদা জগৎ চোখে পড়ে। উত্তরে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত ঘেঁষে গারো পাহাড়ের পাদদেশ, টিলা আর পাহাড়ি নদী। দক্ষিণ ও পূর্বে মদন, মোহনগঞ্জ আর খালিয়াজুরী জুড়ে নিচু হাওরাঞ্চল, যেখানে বর্ষায় জমি, গ্রাম আর পথ সব পানির নিচে চলে যায়, গ্রামগুলো ভেসে থাকে দ্বীপের মতো। ডিঙ্গাপোতা হাওর এর মধ্যে বেশ পরিচিত। শুকনো মৌসুমে এই হাওরই হয়ে ওঠে বোরো ধানের সবুজ সমুদ্র।

হাওরের মানুষের জীবন তাই দুই ঋতুতে দুই রকম। বর্ষায় বাড়ির উঠান থেকে নৌকা ছাড়ে, হাট বসে নৌকায়, স্কুলে যেতেও নৌকা লাগে। ঢেউ থেকে ভিটা বাঁচাতে গ্রামের চারপাশে বাঁশ আর কচুরিপানার আড় দেওয়া হয়। এই সময়টাকে স্থানীয়রা বলেন অবসরের মৌসুম; তখনই বসে গানের আসর, পালা আর কিসসা। আবার পানি নামার পর শুরু হয় ধান বোনার ব্যস্ততা, আর বৈশাখে পাকা ধান ঘরে তোলার দৌড়, কারণ আগাম ঢল এলে এক রাতেই পুরো মাঠ তলিয়ে যেতে পারে।

সোমেশ্বরী, কংস, ধনু, মগড়া আর ধলাই জেলার প্রধান নদী। মগড়া নদী শহরের বুক চিরে এঁকেবেঁকে গেছে। মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি, বিশেষ করে বোরো ধান; হাওরে মাছ ধরা আর হাঁস পালন বহু পরিবারের আয়ের উৎস। দুর্গাপুরের বিজয়পুরে সাদা মাটির পাহাড় থেকে চীনামাটি তোলা হয়, আর সোমেশ্বরী থেকে তোলা হয় বালু ও নুড়ি।

নামের রহস্য

নেত্রকোণা নামটি কোথা থেকে এল, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো একক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। স্থানীয়ভাবে নানা গল্প শোনা যায়, তবে সেগুলোর কোনোটিই প্রামাণিক নথিতে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই নামের উৎসের চেয়ে নির্ভরযোগ্যভাবে বলা যায় জেলার প্রশাসনিক ইতিহাস: ব্রিটিশ আমলে উনিশ শতকের শেষ দিকে নেত্রকোণা বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি মহকুমা হয়, আর ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।

অতীতের পথ ধরে

প্রাচীনকালে এই অঞ্চল কামরূপ রাজ্যের প্রভাববলয়ে ছিল বলে ধারণা করা হয়। পনেরো শতকের শেষ দিকে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহ মুসলিম শাসনের অধীনে আসে, পরে ভাটি অঞ্চলে ঈসা খাঁর প্রভাব এবং তারপর মোগল শাসন। নেত্রকোণা সদরের মদনপুরে সুফি সাধক শাহ সুলতান রুমির মাজার এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের প্রাচীন স্মৃতি বহন করে।

ব্রিটিশ আমলে দুর্গাপুর-কলমাকান্দা অঞ্চল জমিদারি শোষণবিরোধী আন্দোলনের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে। হাজং কৃষকদের টংক প্রথাবিরোধী সংগ্রামে প্রাণ দেন হাজং নারী রাশিমণি, যাঁর স্মরণে দুর্গাপুরে স্মৃতিসৌধ আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বারহাট্টার ঠাকুরাকোনা রেলসেতু উড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচলে বাধা দেন। কলমাকান্দা, আটপাড়া, কেন্দুয়া ও মোহনগঞ্জে বিভিন্ন সংঘর্ষ হয়; কলমাকান্দার লেংগুরায় সাত শহীদের সমাধি সেই সময়ের স্মারক। দুর্গাপুরের একটি গ্রামে প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার স্মৃতিও স্থানীয় মানুষ আজও বহন করে।

বাউল, গাহেন আর কবিতার মাটি

নেত্রকোণাকে অনেকে বলেন লোকগানের দেশ। মৈমনসিংহ গীতিকার অনেক পালার পটভূমি এই অঞ্চলের, আর বাউল, ঘাটু, জারি, গাহেন গান এখনো গ্রামের আসরে প্রাণ পায়। কেন্দুয়ার মানুষ কুদ্দুস বয়াতি তাঁর বয়াতি গানের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের প্রবাদ, ধাঁধা আর গান এই সংস্কৃতিকে আরও বৈচিত্র্য দিয়েছে। বিরিশিরির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি সেই ঐতিহ্য রক্ষার কেন্দ্র। দুর্গাপুর আর কলমাকান্দার গারো গ্রামগুলোতে ফসল তোলার পর ওয়ানগালা উৎসব হয়; হাজং সম্প্রদায়ের মধ্যেও নিজস্ব গান, পোশাক আর পূজার রীতি আছে। একাডেমির জাদুঘরে এই জনগোষ্ঠীগুলোর পোশাক, বাদ্যযন্ত্র আর গৃহস্থালির জিনিস সাজানো থাকে।

আধুনিক সাহিত্যেও নেত্রকোণার অবদান চোখে পড়ার মতো। কবি নির্মলেন্দু গুণ ও কবি হেলাল হাফিজ এই জেলার সন্তান। কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের জন্ম মোহনগঞ্জে, আর তাঁর ও তাঁর ভাই লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের পৈতৃক ভিটা কেন্দুয়ার কুতুবপুরে। হুমায়ূন আহমেদের অনেক লেখায় হাওর আর ভাটি অঞ্চলের যে ছবি আসে, তার শিকড় এই মাটিতে।

যা দেখবেন

নেত্রকোণায় বেড়ানোর আসল আকর্ষণ উত্তরের দুর্গাপুর। সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জল আর বালুচর, বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড় যার খাদে জমা পানি সবুজ-নীল রং ধরে, আর বিরিশিরির সাংস্কৃতিক একাডেমি একসঙ্গে দেখা যায়। কাছেই রানীখংয়ের পুরোনো ক্যাথলিক গির্জা টিলার ওপর দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে, আর হাজং মাতা রাশিমণির স্মৃতিসৌধ। বর্ষায় মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওরে নৌকায় ঘোরা এক অন্য অভিজ্ঞতা। শহরের কাছে মদনপুরের শাহ সুলতান রুমির মাজারেও অনেকে যান।

বালিশ, শুঁটকি আর হাওরের মাছ

নেত্রকোণার খাবারের গল্প শুরু হয় বালিশ মিষ্টি দিয়ে। প্রচলিত আছে, শহরের মিষ্টি কারিগর গয়ানাথ ঘোষ প্রায় এক শতাব্দী আগে এর প্রচলন করেন; আকারে বালিশের মতো বলেই এমন নাম। ছানা আর ময়দার বড় মিষ্টিকে রসে ডুবিয়ে ওপরে ক্ষীরের প্রলেপ দেওয়া হয়। গয়ানাথ পরে দেশ ছেড়ে চলে গেলেও তাঁর দোকানের কারিগরদের হাত ধরে ঐতিহ্যটি টিকে আছে। ২০২৫ সালে নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।

মিষ্টির বাইরে নেত্রকোণার রান্নাঘর মূলত হাওরের। বর্ষায় ধরা টাটকা মাছে রাঁধা মাছের ঝোল প্রতিদিনের খাবার, আর শুকনো মৌসুমে সেই মাছ রোদে শুকিয়ে বানানো হয় শুঁটকি। পুঁটি মাছ গাঁজিয়ে বানানো চ্যাপা শুঁটকির ভর্তা আর ভুনা এখানকার মানুষের প্রিয়, যদিও প্রথমবার যাঁরা খান তাঁদের কাছে এর ঝাঁঝ নতুন লাগতে পারে। বিস্তারিত দেখতে পারেন নেত্রকোণার বিখ্যাত খাবার পাতায়।

শীতের সময় নেত্রকোণার গ্রামে পিঠার আয়োজনও কম নয়। নতুন চালের গুঁড়ি আর খেজুরের গুড়ে ভাপা আর চিতই পিঠা হয়, আর হাওরাঞ্চলে চ্যাপা শুঁটকির ঝাল ভর্তা দিয়ে গরম চিতই খাওয়ার চল আছে। মাছ, শুঁটকি আর মিষ্টি মিলে নেত্রকোণার খাবার আসলে হাওর আর গোয়ালঘরের মিলিত গল্প।

যাতায়াত ও ভালো সময়

ঢাকা থেকে নেত্রকোণায় সড়কপথে বাসে যাওয়া যায়, রেলপথেও ট্রেন চলে। দুর্গাপুর-বিরিশিরি যেতে সাধারণত শহর থেকে সড়কপথেই এগোতে হয়। পাহাড় আর সোমেশ্বরী দেখার জন্য শীত ও বসন্ত আরামদায়ক, আর হাওরের জলরাশি দেখতে চাইলে বর্ষা।

সাধারণ প্রশ্ন

নেত্রকোণা কবে জেলা হয়?

ব্রিটিশ আমলে নেত্রকোণা ময়মনসিংহের মহকুমা ছিল। ১৯৮৪ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।

নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি কী?

বালিশের মতো আকারের বড় এই মিষ্টি ছানা ও ময়দায় তৈরি, রসে ডুবিয়ে ওপরে ক্ষীর দেওয়া হয়। এর প্রচলনকারী হিসেবে গয়ানাথ ঘোষের নাম শোনা যায়, আর ২০২৫ সালে এটি জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে।

নেত্রকোণায় বেড়ানোর প্রধান জায়গা কোনগুলো?

দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদী, বিজয়পুরের সাদা মাটির পাহাড়, বিরিশিরি ও রানীখং গির্জা সবচেয়ে জনপ্রিয়। বর্ষায় মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর হাওরও দেখার মতো।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

নেত্রকোণার খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ নেত্রকোণার খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 ময়মনসিংহ বিভাগের অন্য জেলা