Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

পাবনা জেলা: পদ্মার পাড়ে দুধ-ঘিয়ের জনপদ

রাজশাহী বিভাগ · ৯টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. পাবনা নামের নানা ব্যাখ্যা
  2. পুণ্ড্রের প্রান্ত থেকে ব্রিটিশ জেলা
  3. পদ্মা, যমুনা আর চলনবিলের কিনারা
  4. মানুষ ও বিশ্বাস
  5. ঘুরে দেখার মতো
  6. পাবনার ঘি, দই আর নদীর মাছ
  7. যাতায়াত ও মৌসুম
  8. সাধারণ প্রশ্ন

ঈশ্বরদীর পাকশীতে পদ্মার ওপর লাল লোহার খিলানগুলো এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে। নিচ দিয়ে বয়ে যায় শুকনো মৌসুমে শীর্ণ, বর্ষায় উত্তাল পদ্মা, আর পাশেই নতুন সড়কসেতু। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের এই দৃশ্য পাবনা জেলার সবচেয়ে পরিচিত ছবি। কিন্তু পাবনাকে কাছ থেকে চিনতে হলে যেতে হবে বেড়া আর সাঁথিয়ার চরে, যেখানে ভোর হতেই দুধের ক্যান নিয়ে নৌকা ছাড়ে, আর গ্রামের কারখানায় জ্বাল হয় ঘি। রাজশাহী বিভাগের এই জেলা পদ্মা আর যমুনার মাঝখানে, দুই বড় নদীর মিলনস্থলের কাছে।

পাবনা নামের নানা ব্যাখ্যা

পাবনা নামের উৎস নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, গঙ্গার সঙ্গে ‘পাবনী’ নামের একটি নদীর মিলন থেকে নামটি এসেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ কানিংহাম মনে করেছিলেন, প্রাচীন পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধনের নাম থেকে উচ্চারণ বদলে পাবনা হয়েছে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ একাদশ শতকের পাল রাজা রামপালের সময়ে উল্লিখিত ‘পদুম্বা’ নামের জনপদের সঙ্গে মিল খোঁজেন। আবার লোককথায় পাবন নামের এক দস্যুর আস্তানার গল্পও আছে। কোনোটিই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়, তবে প্রতিটিই বলে দেয় অঞ্চলটির অতীত কত পুরোনো।

পুণ্ড্রের প্রান্ত থেকে ব্রিটিশ জেলা

প্রাচীন কালে পাবনা ছিল পুণ্ড্রবর্ধন অঞ্চলের অংশ, পরে পাল ও সেন রাজাদের অধীনে। সুলতানি ও মুঘল আমলে এখানে মুসলিম শাসন বিস্তৃত হয়। চাটমোহরের শাহি মসজিদ ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে মাসুম খান কাবুলির সময়ে নির্মিত বলে পরিচিত। অষ্টাদশ শতকে শহরের কাছে তৈরি হয় জোড় বাংলা মন্দির; স্থানীয় বিবরণ অনুযায়ী মুর্শিদাবাদের নবাবের এক তহশিলদার ব্রজমোহন ক্রোড়ী এটি নির্মাণ করান। দুটি দোচালা ঘর জোড়া লাগিয়ে তৈরি এই মন্দিরের পোড়ামাটির অলংকরণ বাংলার মন্দির স্থাপত্যের এক বিশেষ রূপ।

ব্রিটিশ আমলে ১৮৩২ সালে পাবনা জেলা গঠিত হয়। ১৯১৫ সালে পাকশীতে পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ চালু হলে কলকাতার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের রেল যোগাযোগ সহজ হয়, আর ঈশ্বরদী হয়ে ওঠে বড় রেল জংশন। ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ জেলার শিক্ষার পুরোনো কেন্দ্র। ১৯৫৭ সালে হেমায়েতপুরে প্রতিষ্ঠিত মানসিক হাসপাতাল দেশের এ ধরনের প্রধান প্রতিষ্ঠান।

মুক্তিযুদ্ধে পাবনা শুরু থেকেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জে অবস্থান নেওয়া পাকিস্তানি সেনাদের ওপর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ আক্রমণ চালান। এপ্রিলে নগরবাড়ী ঘাটে বিমান হামলা ও লড়াই হয়। পরের মাসগুলোতে ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা ও হাদল গ্রামে ভয়াবহ গণহত্যা হয়। যুদ্ধের শেষ দিকে বিমান হামলায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের একটি স্প্যান ভেঙে পড়ে, যা পরে মেরামত করা হয়।

পদ্মা, যমুনা আর চলনবিলের কিনারা

পাবনার দক্ষিণ সীমা ধরে বয়ে গেছে পদ্মা, পূর্বে যমুনা। বড়াল, ইছামতী, আত্রাই আর হুরাসাগর নদী জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে, আর উত্তরে চাটমোহর-ভাঙ্গুড়ার দিকে চলনবিলের বিস্তার। গাজনার বিলও জেলার বড় জলাভূমি। নদী আর বিলের এই জাল পাবনাকে উর্বর করেছে; ধান, গম, পাট আর বিশেষ করে পেঁয়াজ চাষে পাবনা দেশের শীর্ষ জেলাগুলোর একটি।

তবে পাবনার সবচেয়ে আলাদা অর্থনীতি দুধের। বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া আর পাশের সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর মিলে গড়ে উঠেছে দেশের অন্যতম বড় দুগ্ধ অঞ্চল। চরের সবুজ ঘাসে গরু চরে, আর সেখানকার দুধ যায় সরকারি-বেসরকারি দুগ্ধ কারখানা, ছানা ও ঘিয়ের ছোট কারখানায়। ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে, আর ঈশ্বরদীতে ইক্ষু ও কৃষি গবেষণার প্রতিষ্ঠানও আছে। তাঁতশিল্প আর হোসিয়ারি পাবনার পুরোনো ঐতিহ্য।

বেড়ার চরে একটা সাধারণ দিনের শুরু দেখলে বোঝা যায়, দুধ এখানে কেবল পণ্য নয়, জীবনের ছন্দ। ভোরে গরু দোহানোর পর দুধ ভরা ক্যান নিয়ে খামারিরা নৌকায় বা ভ্যানে ছোটেন সংগ্রহকেন্দ্রের দিকে। কেউ দুধ বিক্রি করেন বড় কারখানায়, কেউ দেন পাশের ছানা বা ঘিয়ের কারখানায়। বন্যা এলে চরের ঘাস ডুবে যায়, তখন গোখাদ্যের দাম বাড়ে আর খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। তবু চরের বহু পরিবার গরু পালন করেই সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছে।

মানুষ ও বিশ্বাস

পাবনা শহরের কাছে হিমাইতপুরে জন্মেছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী, যিনি ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র নামে পরিচিত। তাঁর আশ্রম এখনো বহু ভক্তের তীর্থ। বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের শৈশব কেটেছে পাবনা শহরে, তাঁর পৈতৃক বাড়িটি এখন স্মৃতি সংগ্রহশালা। জেলার গ্রামে লোকগান, নৌকাবাইচ আর লাঠিখেলার চল আছে।

ঘুরে দেখার মতো

পাকশীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ আর পাশের লালন শাহ সেতু একসঙ্গে দেখা যায়, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তও চমৎকার। শহরের কাছের জোড় বাংলা মন্দির ছোট কিন্তু অনন্য। শীতলাই জমিদারবাড়ি, তাড়াশ ভবন আর চাটমোহরের শাহি মসজিদে পুরোনো পাবনার ছাপ। হিমাইতপুরে অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম, আর শহরের সুচিত্রা সেনের বাড়িও অনেকে দেখতে যান। বর্ষায় গাজনার বিল আর চলনবিলের অংশে নৌকা ভ্রমণ করা যায়।

পাবনার ঘি, দই আর নদীর মাছ

“পাবনার ঘি” কথাটা দেশের অনেক জায়গায় প্রায় প্রবাদের মতো শোনা যায়। বেড়ার ডাকবাংলা ও হাটুরিয়া, সাঁথিয়ার সোনাতলা ও সেলন্দা, ফরিদপুরের গোপালনগর এলাকায় বাড়িতে ও কারখানায় ঘি তৈরি হয়। দুধের সর জমিয়ে মাখন তোলা, তারপর ধীরে জ্বাল দিয়ে দানাদার সোনালি ঘি; গরম ভাতে এক চামচ পড়লে তার ঘ্রাণ পুরো ঘরে ছড়ায়। এত দুধ যে জেলায়, সেখানে মিষ্টি দইয়ের কদর থাকবেই; মাটির পাত্রে জমানো দই বিয়ে আর উৎসবের আবশ্যিক অনুষঙ্গ। আর পদ্মা-যমুনার পাড়ের জেলা বলে পাতে নদীর মাছের ঝোল প্রায় রোজ থাকে, বর্ষায় ইলিশ আর চলনবিলের দেশি মাছ। আলু-বেগুন দিয়ে রুই বা বোয়ালের পাতলা ঝোল, ওপরে কাঁচা মরিচ, আর শেষ পাতে এক চামচ ঘি দিয়ে মসুর ডাল; পাবনার সাধারণ ঘরের দুপুরের খাবার অনেকটা এমনই। ছানা তৈরির কারখানা বেশি বলে আশপাশের মিষ্টির দোকানে ছানার মিষ্টির জোগানও ভালো। বিস্তারিত পাবেন পাবনার বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাতায়াত ও মৌসুম

ঢাকা থেকে পাবনা সাধারণত সড়কপথে যাওয়া হয়, যমুনা সেতু পার হয়ে সিরাজগঞ্জ হয়ে। রেলে গেলে ঈশ্বরদী জংশন পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে সহজে শহরে পৌঁছানো যায়। ঘোরার সবচেয়ে ভালো সময় শীতকাল, তখন পদ্মার চর জেগে ওঠে আর ঘি-দইয়ের স্বাদও জমে।

সাধারণ প্রশ্ন

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কবে চালু হয়?

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীতে পদ্মার ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ১৯১৫ সালে চালু হয়। এটি দেশের অন্যতম পুরোনো ও দীর্ঘ রেলসেতু।

পাবনার ঘি কেন বিখ্যাত?

বেড়া, সাঁথিয়া ও ফরিদপুর উপজেলা দেশের অন্যতম বড় দুধ উৎপাদন এলাকা, সেখানকার দুধ থেকে ঐতিহ্যগতভাবে ঘি তৈরি হয়। এর ঘ্রাণ ও স্বাদের সুনাম দেশে-বিদেশে আছে।

পাবনা জেলা কবে গঠিত হয়?

ব্রিটিশ আমলে ১৮৩২ সালে পাবনা জেলা গঠিত হয়। এটি রাজশাহী বিভাগের পুরোনো জেলাগুলোর একটি।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

পাবনার খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ পাবনার খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রাজশাহী বিভাগের অন্য জেলা