Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

পঞ্চগড় জেলা: দেশের উত্তর সীমানার গড়, চা আর পাহাড়-দেখা ভোর

রংপুর বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. পাঁচ গড়ের নাম
  2. ভিতরগড়: মাটির নিচের নগরী
  3. জলপাইগুড়ি থেকে পঞ্চগড়
  4. চা, পাথর আর করতোয়ার পানি
  5. পঞ্চগড়ে যা দেখবেন
  6. লোকগান আর মানুষের মুখের ভাষা
  7. দুধ চা, পিঠা আর নদীর মাছ
  8. যাত্রাপথ ও মৌসুম
  9. সাধারণ প্রশ্ন

শীতের এক পরিষ্কার ভোরে তেঁতুলিয়ার মহানন্দার পাড়ে দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে তাকালে দিগন্তে ভেসে ওঠে বরফে ঢাকা সাদা চূড়ার সারি। প্রথমে মনে হয় মেঘ, তারপর সূর্যের আলো লাগতেই সেগুলো গোলাপি থেকে সোনালি হয়ে ওঠে। এটাই কাঞ্চনজঙ্ঘা, আর এই দৃশ্য দেখতেই প্রতি শীতে হাজারো মানুষ ছুটে যান বাংলাদেশের সবচেয়ে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। কিন্তু পঞ্চগড় শুধু পাহাড় দেখার জায়গা নয়; এখানে আছে দেশের সবচেয়ে বড় প্রাচীন দুর্গনগরী, সমতলের সবুজ চা-বাগান আর নদীর বুক থেকে পাথর তুলে জীবন চালানো মানুষের গল্প।

পাঁচ গড়ের নাম

পঞ্চগড় নামের ব্যাখ্যা হিসেবে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় পাঁচটি গড় বা দুর্গের কথা: ভিতরগড়, মীরগড়, রাজনগড়, হোসেনগড় আর দেবনগড়। প্রচলিত আছে, এই পাঁচ গড়ের নাম থেকেই জেলার নাম। আরেক মতে, প্রাচীন পুণ্ড্রনগর রাজ্যের "পঞ্চনগরী" নামের অঞ্চল থেকে পঞ্চগড় নামটি এসেছে। কেউ কেউ আবার বলেন, স্থানীয় ভাষায় "গড়" মানে জঙ্গলও বোঝায়, আর একসময় এলাকাটি ঘন বনে ঢাকা ছিল। তবে পাঁচ দুর্গের গল্পটিই সবচেয়ে জনপ্রিয়, আর ভিতরগড়ের ধ্বংসাবশেষ সেই গল্পকে মাটিতে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

ভিতরগড়: মাটির নিচের নগরী

পঞ্চগড় শহর থেকে প্রায় ষোলো কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অমরখানা ইউনিয়নে ছড়িয়ে আছে ভিতরগড়, যাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্গবেষ্টিত প্রাচীন বসতি বলে মনে করা হয়। প্রায় পঁচিশ বর্গকিলোমিটার জুড়ে চারটি চতুর্ভুজ প্রাচীরের বেষ্টনী, যার একটি অংশ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের জলপাইগুড়িতেও গেছে। প্রাচীরগুলো মূলত পোড়া ইট আর মাটির তৈরি, মাঝে মাঝে বুরুজ। সবচেয়ে ভেতরের বেষ্টনীতে মন্দির ও স্তূপের নিদর্শন পাওয়া গেছে।

ভিতরগড়ের সঙ্গে পৃথু রাজার এক করুণ কিংবদন্তি জড়িয়ে আছে। প্রচলিত আছে, কিচক নামের এক জনগোষ্ঠী আক্রমণ করলে অপবিত্র হওয়ার ভয়ে রাজা একটি দিঘিতে ঝাঁপ দেন, আর তাঁর অনুচরেরাও তাঁকে অনুসরণ করে। সেই দিঘিই আজকের মহারাজার দিঘি, প্রায় পঞ্চাশ একরের বিশাল জলাশয়, যার পাড়ে বসে বিকেল কাটাতে আসেন অনেকে। নগরীটি ঠিক কবে গড়ে উঠেছিল, তা নিশ্চিত নয়; গবেষকদের ধারণা, এটি দশম শতকের আগের।

জলপাইগুড়ি থেকে পঞ্চগড়

ইতিহাসের বড় অংশ জুড়ে পঞ্চগড় ছিল সীমান্ত অঞ্চল। মৌর্য, গুপ্ত ও পাল শাসনের পর ষোড়শ শতক থেকে দীর্ঘ সময় এলাকাটি কোচবিহারের কোচ রাজাদের প্রভাবাধীন ছিল। ইংরেজ আমলে পঞ্চগড় ছিল জলপাইগুড়ি জেলার একটি থানা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগে তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়, বোদা আর দেবীগঞ্জ থানা পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে আসে এবং দিনাজপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৮০ সালে পঞ্চগড় মহকুমা গঠিত হয়, আর ১৯৮৪ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এপ্রিলের মাঝামাঝি পাকিস্তানি বাহিনী পঞ্চগড় দখল করে, কিন্তু তেঁতুলিয়ার বড় একটা অংশ প্রায় পুরো যুদ্ধজুড়ে মুক্তাঞ্চল হিসেবে টিকে ছিল। চাওয়াই নদীর ওপর অমরখানার কাছে সেতু উড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর উত্তরমুখী অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দেন। নভেম্বরের শেষে পঞ্চগড় সদর মুক্ত হয়। শহরের ধাক্কামারায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ আছে, আর করতোয়ার পাড়সহ কয়েকটি জায়গায় গণকবর চিহ্নিত হয়েছে।

চা, পাথর আর করতোয়ার পানি

পঞ্চগড়ের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে করতোয়া, মহানন্দা, আত্রাই, টাঙ্গন, ডাহুক, তালমা আর চাওয়াইসহ অনেক নদী। হিমালয়ের পাদদেশের কাছাকাছি হওয়ায় এসব নদীর তলায় পাথর আর নুড়ি জমে, আর সেই পাথর তুলে বিক্রি করা জেলার বহু মানুষের জীবিকা। ভোরে মহানন্দার হাঁটুজলে নেমে পাথর তোলার দৃশ্য তেঁতুলিয়ায় খুব চেনা।

কৃষিই অবশ্য জেলার প্রধান জীবিকা। তবে গত শতকের শেষ দিক থেকে পঞ্চগড়ের মাঠে এক নতুন ফসল জায়গা করে নিয়েছে: চা। সিলেট-চট্টগ্রামের পাহাড়ি টিলার বাইরে সমতলে বাণিজ্যিক চা-চাষের এটিই দেশের প্রধান উদাহরণ। বড় বাগানের পাশাপাশি ছোট কৃষকেরাও নিজেদের জমিতে চা লাগিয়েছেন, আর কাঁচা পাতা বিক্রি হয় স্থানীয় কারখানায়। ২০২২ সালে পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় চা নিলামকেন্দ্র চালু হয়েছে।

পঞ্চগড়ে যা দেখবেন

তেঁতুলিয়ার পুরোনো ডাকবাংলো মহানন্দার পাড়ের উঁচু জমিতে, এখান থেকেই শীতের ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। কাছেই বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, দেশের সর্বোত্তরের বিন্দু এবং একটি স্থলবন্দর। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে এখানে সীমান্তরক্ষী দুই বাহিনীর যৌথ কুচকাওয়াজ হয়, যা দেখতে বিকেলে ভিড় জমে। মালবোঝাই ট্রাকের সারি দেখে বোঝা যায়, দেশের এই প্রান্তটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের কত গুরুত্বপূর্ণ পথ। ভিতরগড় আর মহারাজার দিঘি ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য অবশ্যই দেখার মতো। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে আছে একটি রকস মিউজিয়াম, যেখানে নানা ধরনের পাথর ও প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত। আটোয়ারীর মুঘল আমলের মির্জাপুর শাহী মসজিদ আর বোদার বোদেশ্বরী মন্দিরও দেখা যায়। আর চা-বাগানের সারির মাঝ দিয়ে হাঁটতে চাইলে তেঁতুলিয়ার পথের দুই ধারেই বাগান চোখে পড়বে।

লোকগান আর মানুষের মুখের ভাষা

পঞ্চগড়ের লোকসংস্কৃতিতে ভাওয়াইয়ার পাশাপাশি সত্যপীরের গান, বৈষ্ণব কীর্তন, বাউল, কবিগান আর নটুয়া গানের ধারা আছে। এখানকার মানুষের কথ্য ভাষায় রংপুর অঞ্চলের টানের সঙ্গে সীমান্তের ওপারের প্রভাবও মেশে। হাটের দিনে গরুর গাড়ি, ভ্যান আর বাইসাইকেলে চড়ে আসা মানুষের ভিড় এখনো গ্রামীণ পঞ্চগড়ের চেনা ছবি।

দুধ চা, পিঠা আর নদীর মাছ

চায়ের জেলায় চায়ের কাপই যে আড্ডার কেন্দ্র হবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। শীতের সকালে তেঁতুলিয়ার কুয়াশার মধ্যে ধোঁয়া ওঠা দুধ চা হাতে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপেক্ষা পঞ্চগড় ভ্রমণের সবচেয়ে মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতাগুলোর একটি। শীত এখানে বেশ কড়া, তাই সকালের নাশতায় ভাপা পিঠা, চিতই আর খেজুর গুড়ের কদর বেশি। দুপুরে করতোয়া আর মহানন্দার ছোট মাছের হালকা ঝোল, সঙ্গে ভাত আর ভর্তা, এখানকার ঘরোয়া খাবার। আরও খাবারের খোঁজ পাবেন পঞ্চগড়ের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাত্রাপথ ও মৌসুম

ঢাকা থেকে সড়কপথে বাসে সরাসরি পঞ্চগড় যাওয়া যায়, রেলপথেও আন্তঃনগর ট্রেন চলে। আকাশপথে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে নেমে সড়কপথে পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়া পৌঁছানো যায়। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য অক্টোবরের শেষ থেকে ডিসেম্বর সবচেয়ে উপযুক্ত, যখন আকাশ পরিষ্কার থাকে। জানুয়ারিতে কুয়াশা আর শীত বেশি থাকে, তাই গরম কাপড় সঙ্গে নেওয়া জরুরি। তেঁতুলিয়ায় থাকার জন্য সরকারি ডাকবাংলো ছাড়াও কিছু আবাসিক হোটেল আছে, তবে শীতের ভরা মৌসুমে আগে থেকে জায়গা নিশ্চিত করে যাওয়াই ভালো।

সাধারণ প্রশ্ন

পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা কখন দেখা যায়?

সাধারণত অক্টোবরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আকাশ পরিষ্কার থাকলে তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। ভোর আর সকালের দিকে দৃশ্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট।

পঞ্চগড় নামের অর্থ কী?

প্রচলিত আছে, ভিতরগড়, মীরগড়, রাজনগড়, হোসেনগড় ও দেবনগড় নামের পাঁচটি গড় থেকে পঞ্চগড় নাম এসেছে। প্রাচীন "পঞ্চনগরী" থেকে নামটির উৎপত্তির মতও আছে।

ভিতরগড় কী?

ভিতরগড় পঞ্চগড়ের অমরখানা ইউনিয়নে অবস্থিত এক প্রাচীন দুর্গনগরী, যা দেশের সবচেয়ে বড় দুর্গবেষ্টিত বসতি বলে মনে করা হয়। এর চারটি প্রাচীর-বেষ্টনী ও মহারাজার দিঘি এখনো দেখা যায়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

পঞ্চগড়ের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ পঞ্চগড়ের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রংপুর বিভাগের অন্য জেলা