Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

রাজশাহী জেলা: পদ্মার পাড়ে রেশম, আম আর জ্ঞানের শহর

রাজশাহী বিভাগ · ১৩টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. ‘রাজ’ আর ‘শাহী’: নামের নানা গল্প
  2. সুলতানি মসজিদ থেকে ব্রিটিশ জেলা
  3. পদ্মা, বরেন্দ্র আর রেশমের পোকা
  4. গম্ভীরা, কবিগান আর শিক্ষার আবহ
  5. পুঠিয়া থেকে পদ্মার বাঁধ
  6. কালাই রুটি, আম আর মিষ্টির দোকান
  7. ঢাকা থেকে রাজশাহী
  8. সাধারণ প্রশ্ন

সন্ধ্যায় রাজশাহী শহরের পদ্মার বাঁধে হাঁটলে চোখে পড়ে বিস্তৃত বালুচর, দূরে ভারতের সীমান্তের ঝাপসা গাছপালা, আর বাঁধের ওপর চায়ের কাপ হাতে আড্ডা দেওয়া ছাত্রছাত্রী। পরিচ্ছন্ন রাস্তা, সবুজ গাছ আর অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে রাজশাহীকে অনেকে শিক্ষানগরী বলেন, আবার রেশমের জন্য ডাকেন রেশম নগরী। রাজশাহী জেলা দেশের উত্তর-পশ্চিমে, পদ্মার উত্তর তীরে। এর গ্রামাঞ্চলজুড়ে আমবাগান, পানের বরজ আর বরেন্দ্রের লাল মাটি, আর ইতিহাসে আছে সুলতানি মসজিদ থেকে জমিদারি মন্দির পর্যন্ত বহু স্তর।

‘রাজ’ আর ‘শাহী’: নামের নানা গল্প

রাজশাহী নাম নিয়ে কয়েকটি মত প্রচলিত আছে। ইতিহাসবিদ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মনে করতেন, নাটোরের রানী ভবানীর জমিদারির নাম থেকেই রাজশাহী নামটি এসেছে। আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, সংস্কৃত ‘রাজ’ আর ফারসি ‘শাহী’, দুটো শব্দেরই অর্থ রাজকীয়; এই দুইয়ের মিলনে নামটির জন্ম। কেউ কেউ পঞ্চদশ শতকের রাজা গণেশের শাসনের সঙ্গেও নামটির যোগ খোঁজেন। আজকের শহরটি গড়ে উঠেছিল রামপুর ও বোয়ালিয়া নামের দুটি গ্রামকে কেন্দ্র করে, যে কারণে পুরোনো নথিতে শহরটিকে রামপুর-বোয়ালিয়া বলা হতো।

সুলতানি মসজিদ থেকে ব্রিটিশ জেলা

রাজশাহী অঞ্চল প্রাচীন বরেন্দ্র ভূমির কেন্দ্রে। ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে এখানে সুফি সাধক শাহ মখদুম রূপোশের আগমন ঘটে বলে প্রচলিত আছে, শহরে তাঁর দরগাহ আজও বহু মানুষের ভক্তির স্থান। ১৫২৩ সালে সুলতান নুসরত শাহের সময়ে নির্মিত বাঘা মসজিদ সুলতানি স্থাপত্যের এক সুন্দর উদাহরণ; ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে এর ছাদ ভেঙে পড়েছিল, পরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংস্কার করে।

১৭৭২ সালে ব্রিটিশরা রাজশাহী জেলা গঠন করে। তখন জেলার সদর ছিল নাটোরে। নারদ নদী শুকিয়ে যাওয়ায় উনিশ শতকের প্রথম ভাগে দপ্তর সরে আসে পদ্মার তীরে, আর এভাবেই আধুনিক রাজশাহী শহরের বিকাশ। বিশাল এই জেলা ভেঙে পরে বগুড়া, পাবনা, মালদহসহ বিভিন্ন জেলা গঠিত হয়। ১৯৮৪ সালে বৃহত্তর রাজশাহীর মহকুমাগুলো থেকে নওগাঁ, নাটোর ও নবাবগঞ্জ আলাদা জেলা হয়।

১৯১০ সালে শরৎকুমার রায়, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও রমাপ্রসাদ চন্দ মিলে বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গড়ে তোলেন। তাঁদের সংগ্রহ থেকেই জন্ম নেয় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, যার ভবন ১৯১৯ সালে উদ্বোধন হয়। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ১৮ ফেব্রুয়ারি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হন।

মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী ছিল রক্তাক্ত এক রণাঙ্গন। পাকিস্তানি বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে ক্যাম্প করে, আর আশপাশে বহু মানুষকে হত্যা করে পুঁতে রাখে। ভারতে আশ্রয় নিতে যাওয়া শরণার্থীদের ওপর পদ্মার পাড়ে হত্যাযজ্ঞ চলে, চারঘাট বাজার পোড়ানো হয়। বাগমারার তাহিরপুরের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের একটি টহল নৌকায় সফল আক্রমণ চালান।

পদ্মা, বরেন্দ্র আর রেশমের পোকা

রাজশাহী জেলার দক্ষিণ সীমা জুড়ে পদ্মা, যার ওপারে ভারত। মহানন্দা আর শিব নদীও জেলার জলধারা, আর গোদাগাড়ী-তানোরের দিকে উঁচু বরেন্দ্র ভূমি। একসময় শুকনো এই অঞ্চলে গভীর নলকূপের সেচ আসার পর ধানের চাষ বেড়েছে বহুগুণ।

রাজশাহীর অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক। বাঘা, চারঘাট আর পবার আমবাগান বিখ্যাত, পানের বরজে এই জেলা দেশের শীর্ষে, আর সবজি চাষেও রাজশাহী এগিয়ে। রেশম চাষ ও রেশমি কাপড় বোনার ঐতিহ্য এখানে বহু পুরোনো; শহরের রেশম কারখানায় তৈরি শাড়ি আর থান কাপড় রাজশাহী সিল্ক নামে পরিচিত। রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জাতীয় প্রতিষ্ঠানও এই শহরে।

রেশম তৈরির প্রক্রিয়া ধৈর্যের কাজ। তুঁতগাছের পাতা খাইয়ে পোকা পালন করা হয়, পোকা নিজের চারপাশে গুটি বাঁধে, সেই গুটি সেদ্ধ করে সূক্ষ্ম সুতা ছাড়ানো হয়। তারপর সেই সুতা রং করে তাঁতে বোনা হয় শাড়ি, থ্রিপিস আর থান কাপড়। শহরের সপুরা এলাকায় রেশমের কারখানা আর বিক্রয়কেন্দ্র ঘুরে এই পুরো প্রক্রিয়ার কিছু অংশ নিজের চোখে দেখা যায়। আমের মৌসুমে আবার বাঘা আর চারঘাটের বাগানে চিত্র অন্যরকম; পাড়া আম ঝুড়িতে সাজিয়ে হাটে তোলা হয়, আর সেখান থেকে ট্রাকে ও কুরিয়ারে দেশের নানা প্রান্তে যায়।

গম্ভীরা, কবিগান আর শিক্ষার আবহ

রাজশাহীর গ্রামে গম্ভীরা, কবিগান, মেয়েলি গীত আর পুতুলনাচের চল আছে। শহরে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরোনো সরকারি কলেজ মিলে এক ধরনের ছাত্রাবাসী আবহ তৈরি করেছে, যা শহরের সন্ধ্যার চায়ের দোকান আর বইয়ের দোকানে টের পাওয়া যায়। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন।

পুঠিয়া থেকে পদ্মার বাঁধ

রাজশাহী শহর থেকে পূর্বে পুঠিয়ায় জমিদারদের তৈরি মন্দিরগুচ্ছ দেশের অন্যতম সুন্দর ঐতিহ্যবাহী এলাকা। দিঘির পাড়ে বিশাল শিবমন্দির, পোড়ামাটির কারুকাজের গোবিন্দ মন্দির আর সামনে পুঠিয়া রাজবাড়ির দোতলা প্রাসাদ একসঙ্গে চোখে পড়ে। শহরের বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে পাল-সেন যুগের ভাস্কর্য, পাহাড়পুরের পোড়ামাটির ফলক আর প্রাচীন পুঁথি সংরক্ষিত। বাঘা উপজেলার বাঘা মসজিদ, শহরের শাহ মখদুমের দরগাহ আর পদ্মার পাড়ের বাঁধ ও উদ্যান ঘুরে দেখার মতো।

কালাই রুটি, আম আর মিষ্টির দোকান

রাজশাহীর শীতের রাত মানে কালাই রুটি। মাষকলাই আর চালের আটা মিশিয়ে হাতে চাপড়ে বানানো মোটা রুটি মাটির তাওয়ায় সেঁকা হয়, সঙ্গে বেগুন ভর্তা, ঝাল মরিচ-পেঁয়াজ বাটা কিংবা হাঁসের মাংস। শহরের অনেক মোড়ে সন্ধ্যার পর কালাই রুটির ছোট দোকানে ভিড় জমে। কারিগর দুই হাতের তালুতে চাপড় দিয়ে দিয়ে খামিরকে গোল করেন, চাটুতে দেওয়ার পর রুটি ফুলে ওঠে, আর পোড়া দাগসহ গরম গরম পরিবেশন করা হয়। একসময় গ্রামের গরিব মানুষের খাবার হিসেবে পরিচিত এই রুটি এখন শহরের রেস্তোরাঁর মেনুতেও জায়গা পেয়েছে, আর ঢাকাতেও রাজশাহীর কালাই রুটির দোকান খুলেছে। গ্রীষ্মে অবশ্য পুরো রাজশাহী আমময়; বাঘা-চারঘাটের গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি আর ল্যাংড়া, তারপর ফজলি। শহরের পুরোনো মিষ্টির দোকানে রসগোল্লা, চমচম আর দইয়ের স্বাদও নেওয়া যায়, বিশেষ করে বিয়ে আর উৎসবের মৌসুমে মিষ্টির চাহিদা বাড়ে। আরও জানতে দেখুন রাজশাহীর বিখ্যাত খাবার।

ঢাকা থেকে রাজশাহী

ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার তিনটি পথই চালু: সড়কপথে যমুনা সেতু পার হয়ে, রেলপথে আন্তনগর ট্রেনে, আর আকাশপথে শাহ মখদুম বিমানবন্দরে। শহর আর পুঠিয়া ঘোরার জন্য শীতকাল সেরা, তখন কালাই রুটিও জমে; আম খেতে চাইলে মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যান।

সাধারণ প্রশ্ন

রাজশাহীকে রেশম নগরী বলা হয় কেন?

রাজশাহী অঞ্চলে বহুকাল ধরে রেশম চাষ ও রেশমি কাপড় বোনা হয়, আর এখানকার সিল্ক শাড়ি সারা দেশে পরিচিত। রেশম বোর্ড ও রেশম গবেষণা প্রতিষ্ঠানও এই শহরে অবস্থিত।

পুঠিয়া মন্দির কোথায়?

পুঠিয়া মন্দিরগুচ্ছ রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলায়, শহর থেকে পূর্বে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের কাছে। এখানে শিবমন্দির, গোবিন্দ মন্দির ও পুঠিয়া রাজবাড়ি দেখা যায়।

রাজশাহী জেলা কবে গঠিত হয়?

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৭২ সালে রাজশাহী জেলা গঠিত হয়। প্রথমে এর সদর ছিল নাটোরে, পরে পদ্মার তীরে স্থানান্তরিত হয়।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

রাজশাহীর খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ রাজশাহীর খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রাজশাহী বিভাগের অন্য জেলা