রাঙামাটি জেলা: হ্রদ আর পাহাড়ের শহর
চট্টগ্রাম বিভাগ · ১০টা উপজেলা · পড়তে ৫ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
কাপ্তাই হ্রদের নীল পানির নিচে ঘুমিয়ে আছে একটা পুরোনো রাজবাড়ি, কয়েকশো গ্রাম আর অসংখ্য মানুষের ফেলে আসা ঘর। শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে কোথাও কোথাও পুরোনো দেয়ালের ভিত উঁকি দেয়, আর বয়স্ক মানুষেরা দেখিয়ে দেন, এখানে একসময় তাঁদের বাড়ি ছিল। রাঙামাটি জেলার সৌন্দর্য তাই শুধু পোস্টকার্ডের দৃশ্য নয়, এর পেছনে আছে বাস্তুচ্যুতি, অভিযোজন আর নতুন করে বাঁচার গল্প। আজ নৌকায় ভেসে পাহাড়ের সারি, ঝরনা আর দ্বীপের মতো ছোট ছোট টিলা দেখতে মানুষ এখানে আসেন, কিন্তু একটু থেমে শুনলে বোঝা যায় এই হ্রদের প্রতিটি বাঁকে ইতিহাস জমে আছে।
রাঙা মাটির নাম
রাঙামাটি নামের উৎস নিয়ে লিখিত দলিল খুব একটা নেই, তবে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। প্রচলিত আছে, এখানকার পাহাড়ের মাটির লালচে রং থেকেই জায়গাটির নাম হয় রাঙামাটি। কারও কারও মতে, এক সময় কোনো একটি হ্রদ বা ছড়ার পানি লালচে মাটির কারণে রাঙা দেখাত, আর সেখান থেকে নামের জন্ম। ব্রিটিশ আমলের আগে এই পাহাড়ি অঞ্চল মোগল নথিতে "কার্পাস মহল" নামে পরিচিত ছিল, কারণ এখান থেকে কার্পাস তুলা কর হিসেবে আদায় করা হতো।
চাকমা রাজা থেকে পার্বত্য জেলা
রাঙামাটির ইতিহাস চাকমা রাজাদের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী মোগলদের সঙ্গে চাকমা রাজাদের সংঘাত হয়েছিল, আর একটি পুরোনো কামান চাকমা রাজবাড়িতে আজও সংরক্ষিত বলে জানা যায়। পরে চাকমা রাজারা মোগলদের সঙ্গে কার্পাস তুলা কর দেওয়ার সমঝোতায় আসেন।
১৮৬০ সালের ২০ জুন ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রাম থেকে পাহাড়ি অঞ্চল আলাদা করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা গঠন করে, আর পরে এর সদর দপ্তর রাঙামাটিতে স্থাপিত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে অঞ্চলটি তিনটি সার্কেলে বিভক্ত, যার মধ্যে চাকমা সার্কেলের প্রধান রাঙামাটিতে থাকেন এবং খাজনা আদায়সহ প্রথাগত দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমে বান্দরবান ও পরে খাগড়াছড়ি আলাদা জেলা হলে বাকি অংশ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা নামে পরিচিত হয়। আয়তনে এটি এখন দেশের সবচেয়ে বড় জেলা।
কাপ্তাই বাঁধ আর হ্রদের জন্ম
বিশ শতকের ষাটের দশকের শুরুতে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাইয়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয়। বাঁধের ফলে পানি জমে তৈরি হয় দেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ, কাপ্তাই হ্রদ। এতে বিপুল পরিমাণ চাষের জমি ডুবে যায়, পুরোনো রাঙামাটি শহর ও চাকমা রাজবাড়িসহ বহু গ্রাম পানির নিচে চলে যায়, আর বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। আজকের রাঙামাটি শহর গড়ে উঠেছে হ্রদের পাড়ের টিলাগুলোর ওপর, আর নতুন চাকমা রাজবাড়িও তৈরি হয়েছে হ্রদের ধারে।
বুড়িঘাটের বীর
১৯৭১ সালে রাঙামাটি ছিল ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে। এই জেলার মাটিতে লেখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের এক অসাধারণ বীরত্বগাথা। এপ্রিল মাসে নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে পাকিস্তানি বাহিনীর লঞ্চ ও স্পিডবোটের আক্রমণ ঠেকাতে ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ একাই মেশিনগান চালিয়ে যান, যাতে তাঁর সঙ্গীরা নিরাপদে সরে যেতে পারেন। শেষ পর্যন্ত শত্রুর মর্টারের গোলায় তিনি শহীদ হন এবং মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব পান। বুড়িঘাটে হ্রদের মাঝের একটি টিলায় তাঁর সমাধি রয়েছে, যেখানে নৌকায় করে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া যায়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি রাঙামাটি শত্রুমুক্ত হয়।
হ্রদ, পাহাড় আর জীবিকা
রাঙামাটির প্রধান নদী কর্ণফুলী, আর তার শাখা-উপনদী কাচালং, চেঙ্গী, মাইনী, রাইংখ্যং সবই এসে মিশেছে হ্রদে। জেলার বড় অংশে যাতায়াত চলে নৌপথে; হাটের দিনে হ্রদজুড়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় মানুষ আর পণ্য আসা-যাওয়া করে। পাহাড়ের ঢালে জুম চাষে ধান, ভুট্টা, তিল আর নানা সবজি হয়। আনারস, কাঁঠাল, আম, কলা আর কাজুবাদাম এখানকার উল্লেখযোগ্য ফল।
হ্রদে মাছ ধরা হাজারো পরিবারের জীবিকা; কাচকি, চাপিলা আর নানা ধরনের মাছ এখান থেকে ধরা পড়ে দেশের বাজারে যায়। কাপ্তাইয়ের জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র আর চন্দ্রঘোনার কর্ণফুলী কাগজকল জেলার পরিচিত শিল্পকেন্দ্র। গত কয়েক দশকে পর্যটন হয়ে উঠেছে আয়ের বড় উৎস।
মানুষের বৈচিত্র্য
রাঙামাটিতে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, পাংখোয়া, লুসাইসহ নানা জাতিগোষ্ঠী আর বাঙালির বাস। চাকমা জনগোষ্ঠী এখানে সবচেয়ে বড় পাহাড়ি সম্প্রদায়, আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যাও বেশি। রাজবন বিহার পার্বত্য অঞ্চলের বৌদ্ধদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র; প্রতি বছর কঠিন চীবর দানের সময় একদিনের মধ্যে সুতা কেটে, কাপড় বুনে ভিক্ষুদের চীবর তৈরি করে দান করা হয়, যা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। চৈত্রের শেষে বিজু, সাংগ্রাই আর বৈসুক উৎসবে হ্রদে ফুল ভাসানো হয়।
কোমর তাঁতে বোনা রঙিন কাপড় রাঙামাটির হস্তশিল্পের প্রাণ; শহরের তবলছড়ি আর বনরূপা বাজারে এসব কাপড় পাওয়া যায়। চিত্রশিল্পী কনকচাঁপা চাকমা এবং চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবির এই জেলার মানুষ হিসেবে উল্লেখিত।
দেখার জায়গা
- কাপ্তাই হ্রদ ও ঝুলন্ত সেতু: রাঙামাটির প্রতীক হয়ে ওঠা সেতু, বর্ষায় যার কিছু অংশ পানিতে ডুবেও যায়।
- শুভলং ঝরনা: নৌকায় হ্রদ পেরিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নামা ঝরনা, বর্ষায় সবচেয়ে উচ্ছল।
- রাজবন বিহার ও চাকমা রাজবাড়ি: শহরের পাশে হ্রদঘেঁষা ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান।
- বুড়িঘাটে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধি।
- সাজেক উপত্যকা: বাঘাইছড়ি উপজেলার উঁচু পাহাড়ে মেঘের ভেলা দেখার জন্য বিখ্যাত।
- কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান: হ্রদের ধারে বনাঞ্চল আর পাখির রাজ্য।
হ্রদের মাছ আর বাঁশের স্বাদ
রাঙামাটির খাবার হ্রদ আর পাহাড় দুটোকেই ধরে রাখে। বর্ষায় পাহাড়ি বাজারে আসে বাঁশ কোড়ল, অর্থাৎ কচি বাঁশের অঙ্কুর। পাতলা করে কেটে সেদ্ধ করে নাপ্পি বা শুঁটকির সঙ্গে রাঁধা হয়, কেউ মুরগির মাংস মিশিয়ে ঝোল করেন। বাঁশের চোঙে মুরগি বা মাছ ভরে আগুনে পোড়ানোর রেওয়াজও এখানে চেনা, যাতে খাবারে বাঁশের সুবাস মিশে যায়।
হ্রদের টাটকা মাছের ঝোল রাঙামাটির রোজকার খাবার। কাচকি মাছ দিয়ে চচ্চড়ি, আর বড় মাছ সবজি ও কাঁচা মরিচ দিয়ে হালকা ঝোল, পাহাড়ি রান্নায় তেল-মশলা কম, স্বাদ আসে টাটকা উপাদান থেকে। পাহাড়ি আনারস স্বাদে মিষ্টি আর রসালো; গ্রীষ্মে নৌকা ভর্তি আনারস নিয়ে বাজারে আসার দৃশ্য রাঙামাটির পরিচিত ছবি। জেলার খাবারের তালিকা আর হদিস পাবেন রাঙামাটির বিখ্যাত খাবার পাতায়।
ঢাকা থেকে রাঙামাটি
ঢাকা থেকে রাঙামাটি যাওয়ার প্রধান উপায় সড়কপথ; সরাসরি বাস চলে, অথবা চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রেন বা বিমানে গিয়ে সেখান থেকে বাসে যাওয়া যায়। জেলার ভেতরে অনেক জায়গায় যেতে হয় নৌপথে। শুভলং ঝরনা ভরা দেখতে চাইলে বর্ষার শেষ ভালো সময়, আর হ্রদে আরামদায়ক নৌভ্রমণের জন্য অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি উপযুক্ত। কঠিন চীবর দান সাধারণত শরতের শেষে অনুষ্ঠিত হয়।
সাধারণ প্রশ্ন
কাপ্তাই হ্রদ কীভাবে তৈরি হয়েছে?
ষাটের দশকে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি জমে এই কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ।
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধি কোথায়?
তাঁর সমাধি রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাটে, কাপ্তাই হ্রদের মাঝের একটি টিলায়। শহর থেকে নৌকায় সেখানে যাওয়া যায়।
সাজেক উপত্যকা কোন জেলায়?
সাজেক উপত্যকা রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায়। তবে সড়কপথে সেখানে যেতে বেশির ভাগ পর্যটক খাগড়াছড়ি হয়ে যান।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh