Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

সাতক্ষীরা জেলা: লোনা জলের সীমান্ত, আম আর সন্দেশের দেশ

খুলনা বিভাগ · ৭টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. সাতঘরিয়া থেকে সাতক্ষীরা
  2. প্রতাপাদিত্যের রাজধানী থেকে আধুনিক জেলা
  3. একাত্তরের সাতক্ষীরা
  4. নদী, ঘের, সুন্দরবন
  5. মানুষ, মেলা আর ধর্মস্থান
  6. যেখানে যাবেন
  7. চিংড়ি মালাইকারি, আম আর সন্দেশ
  8. যাতায়াত ও মৌসুম
  9. সাধারণ প্রশ্ন

শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে খোলপেটুয়া নদীর পাড়ে দাঁড়ালে ওপারে দেখা যায় সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। জোয়ারের সময় নদী ফুলে ওঠে, ভাটায় জেগে ওঠে কাদামাটি আর শ্বাসমূল। এখান থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ উত্তরে গেলেই কলারোয়ার আমবাগান, আর পশ্চিমে ইছামতীর ওপারে ভারত। সাতক্ষীরা জেলা এই তিনের মাঝখানে: বন, বাগান আর সীমান্ত। খুলনা বিভাগের সবচেয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমের এই জেলার মানুষ লোনা জলের সঙ্গে লড়ে, আবার সেই জলেই চিংড়ি চাষ করে দেশের রপ্তানি আয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

সাতঘরিয়া থেকে সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরা নামের সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি একটি পরিবারের গল্প। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের এক কর্মচারী বিষ্ণুরাম চক্রবর্তী নিলামে এখানকার একটি পরগনা কিনে নেন এবং সাতঘরিয়া গ্রামে বসতি গড়েন। তাঁর ছেলে প্রাণনাথ এলাকার উন্নয়ন করেন, আর পরে ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মুখে সাতঘরিয়াই সাতক্ষীরা হয়ে যায় বলে মনে করা হয়। আরেকটি লোককথা আরও রোমাঞ্চকর। প্রচলিত আছে, সমুদ্রপথে ভ্রমণের সময় সাতজন সাধু এখানে নেমে ক্ষীর রান্না করে খেয়েছিলেন, সেই "সাত ক্ষীর" থেকেই নাম। মিষ্টির জন্য বিখ্যাত জেলার জন্য দ্বিতীয় গল্পটা মানানসই, যদিও প্রথমটিকেই ইতিহাসের কাছাকাছি ধরা হয়।

প্রতাপাদিত্যের রাজধানী থেকে আধুনিক জেলা

সাতক্ষীরার ইতিহাস অনেক পুরোনো। কলারোয়ায় কপোতাক্ষের তীরের প্রাচীন ঢিবি ও কোটবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, সোনাবাড়িয়ার পুরোনো মঠ এ অঞ্চলের দীর্ঘ বসতির ইঙ্গিত দেয়। ষোড়শ শতকে বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম রাজা প্রতাপাদিত্যের যশোর রাজ্যের রাজধানী ছিল আজকের শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর-ধুমঘাট এলাকায়। সেখানেই রয়েছে যশোরেশ্বরী কালীমন্দির, হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে যা একান্ন সতীপীঠের একটি হিসেবে গণ্য। প্রতাপাদিত্যের নৌবাহিনীর স্মৃতিবিজড়িত জাহাজঘাটা দুর্গের ধ্বংসাবশেষও শ্যামনগরে।

ব্রিটিশ আমলে ১৮৬১ সালে যশোর জেলার অধীনে সাতক্ষীরা মহকুমা হয়। ১৮৮২ সালে খুলনা জেলা গঠিত হলে সাতক্ষীরা খুলনার সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৮৪ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।

একাত্তরের সাতক্ষীরা

সীমান্ত জেলা হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধে সাতক্ষীরার ভূমিকা ছিল বিশেষ। যুদ্ধের শুরুতে স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদ প্রতিরোধ গড়ে তোলে, ট্রেজারি থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়, আর ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে প্রবাসী সরকারের কাছে পাঠানো হয়। এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী শহরে ঢুকে গণহত্যা চালায়, বিশেষ করে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শরণার্থী শিবিরে বহু মানুষ নিহত হন। ভোমরা, দেবহাটা, শ্যামনগর, আশাশুনি, কলারোয়ার নানা জায়গায় সারা বছর লড়াই চলেছে। ভারতে আশ্রয় নিতে যাওয়া শরণার্থীদের ওপর হামলার স্মৃতিও এই জেলার ইতিহাসে আছে। শহরের কয়েকটি সড়ক শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করা হয়েছে।

নদী, ঘের, সুন্দরবন

সাতক্ষীরার নদীগুলো জোয়ার-ভাটার: ইছামতী, কালিন্দী, যমুনা, বেতনা, কপোতাক্ষ, খোলপেটুয়া, রায়মঙ্গল, মালঞ্চ। জেলার দক্ষিণ অংশ, বিশেষ করে শ্যামনগর, সুন্দরবনের সঙ্গে লাগোয়া। আয়তনে শ্যামনগর দেশের বড় উপজেলাগুলোর একটি, যার বড় অংশ বনভূমি।

সাতক্ষীরার অর্থনীতির কেন্দ্রে চিংড়ি। লোনা পানির ঘেরে বাগদা আর মিঠা-আধালোনা পানিতে গলদা চিংড়ির চাষ হয়, দেশের রপ্তানি করা চিংড়ির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এই জেলা থেকে। চিংড়ির পাশাপাশি কাঁকড়া চাষও দ্রুত বাড়ছে। তবে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় আর বাঁধ ভাঙনে উপকূলের মানুষ বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অনেক গ্রামে খাবার পানির সংকট নিত্যদিনের। পুকুরের পানি শোধন করে, বৃষ্টির পানি বড় মটকায় জমিয়ে রেখে বছর পার করেন উপকূলের মানুষ।

শ্যামনগর ও আশাশুনির বহু পরিবার সুন্দরবনের ওপরও নির্ভরশীল। মৌসুমে মৌয়ালরা দল বেঁধে মধু সংগ্রহে যান, জেলেরা খালে মাছ আর কাঁকড়া ধরেন। বনে ঢোকার আগে বনবিবির কাছে মানত করার রীতি এখনো টিকে আছে, কারণ বাঘ আর কুমিরের ভয় এই জীবনের অংশ। এখানকার নারীরা নদীতে জাল টেনে চিংড়ির পোনা ধরেন, যা ঘেরে বিক্রি হয়। সব মিলে সাতক্ষীরার দক্ষিণাঞ্চলের জীবন কঠিন, কিন্তু অদ্ভুতভাবে প্রাণবন্ত।

উত্তরের সাতক্ষীরা আবার অন্যরকম, সেখানে আমের বাগান। হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি এখানকার পরিচিত জাত। দক্ষিণ-পশ্চিমের আবহাওয়ার কারণে সাতক্ষীরার আম অন্য অঞ্চলের আগেই পাকে, তাই মৌসুমের প্রথম আম প্রায়ই এখান থেকেই বাজারে আসে। বিদেশেও এখান থেকে আম রপ্তানি হয়েছে। ভোমরা স্থলবন্দর ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।

মানুষ, মেলা আর ধর্মস্থান

সাতক্ষীরায় হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের দীর্ঘ সহাবস্থানের ছাপ স্পষ্ট। তালায় অবস্থিত তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ উনিশ শতকের মাঝামাঝি নির্মিত, বহু গম্বুজের এই মসজিদ স্থাপত্যের দিক থেকে দেখার মতো। নলতায় শায়িত আছেন আহ্‌ছানিয়া মিশনের প্রতিষ্ঠাতা খানবাহাদুর আহ্‌ছানউল্লা, তাঁর জন্মও এই নলতায়। নলতা শরিফে প্রতি বছর বড় জমায়েত হয়। লোকসংস্কৃতিতে জারিগান, পুঁথিপাঠ, রথের মেলা, নৌকাবাইচ আর ঘোড়দৌড়ের ঐতিহ্য রয়েছে।

যেখানে যাবেন

  • শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ও কলাগাছিয়া হয়ে সুন্দরবন
  • ঈশ্বরীপুরে যশোরেশ্বরী কালীমন্দির ও প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিবিজড়িত স্থান
  • তালার তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ
  • নলতা শরিফ, খানবাহাদুর আহ্‌ছানউল্লার মাজার
  • দেবহাটার মন্দির ও ইছামতীর পাড়
  • সুন্দরবনের কোলে মান্দারবাড়িয়া সৈকত, নৌপথে যাওয়ার মতো দূরের জায়গা

চিংড়ি মালাইকারি, আম আর সন্দেশ

সাতক্ষীরার রান্নাঘরে চিংড়ির উপস্থিতি অবধারিত। ঘেরের তাজা গলদা চিংড়ি নারকেলের দুধে রেঁধে মালাইকারি করা হয় বিশেষ দিনে, অতিথি এলে, বিয়ের দাওয়াতে। নারকেল এ অঞ্চলে সহজে মেলে বলে ঝোলটা হয় ঘন ও হালকা মিষ্টি। প্রতিদিনের পাতে থাকে ছোট চিংড়ির চচ্চড়ি, লাউ-চিংড়ি, কিংবা নদীর ভেটকি আর পারশে মাছের ঝোল। শ্যামনগরের দিকে কাঁকড়া ভুনাও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। খুলনা অঞ্চলের মতো এখানেও চুইঝাল দিয়ে মাংস রাঁধার চল আছে, আর শীতে সুন্দরবনের মধু ও খেজুর গুড় দুটোই হাটে মেলে।

মিষ্টির প্রসঙ্গে সাতক্ষীরার সন্দেশের নাম অনেকে আলাদা করে বলেন। কলারোয়াসহ জেলার বিভিন্ন জায়গায় ঘোষ পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাঠের চুলায় দুধ জ্বাল দিয়ে, নিজ হাতে ছানা কেটে সন্দেশ বানিয়ে আসছেন। নরম, হালকা মিষ্টি এই সন্দেশ শীতে খেজুর গুড় দিয়েও তৈরি হয়। আর গ্রীষ্মে সাতক্ষীরা মানেই আম, পাকা হিমসাগরের ঘ্রাণে তখন বাজার ভরে থাকে। খাবার নিয়ে বিস্তারিত পাবেন সাতক্ষীরার বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাতায়াত ও মৌসুম

ঢাকা থেকে সাতক্ষীরায় সড়কপথে সরাসরি বাস চলে, পদ্মা সেতু হয়ে যাত্রা এখন আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে সম্ভব। আকাশপথে যশোর পর্যন্ত গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথেও আসা যায়। সুন্দরবন আর মন্দির-মসজিদ ঘুরতে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে ভালো, আর আম খেতে চাইলে মে-জুন। বর্ষায় উপকূলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থাকে, তাই সুন্দরবন ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার খবর দেখে নেওয়া জরুরি।

সাধারণ প্রশ্ন

সাতক্ষীরা কিসের জন্য বিখ্যাত?

সাতক্ষীরা চিংড়ি চাষ, হিমসাগরসহ নানা জাতের আম, সুন্দরবন, যশোরেশ্বরী মন্দির আর ঐতিহ্যবাহী সন্দেশের জন্য বিখ্যাত।

সাতক্ষীরা থেকে কীভাবে সুন্দরবনে যাওয়া যায়?

সাধারণত শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ বা আশপাশের ঘাট থেকে অনুমতি নিয়ে নৌকা বা ট্রলারে সুন্দরবনের ভেতরে যাওয়া হয়।

সাতক্ষীরা নামের উৎপত্তি কী?

প্রচলিত মতে, বিষ্ণুরাম চক্রবর্তীর বসতি সাতঘরিয়া গ্রামের নাম থেকে সাতক্ষীরা হয়েছে। সাত সাধুর ক্ষীর রান্নার একটি লোককথাও প্রচলিত আছে।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

সাতক্ষীরার খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ সাতক্ষীরার খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 খুলনা বিভাগের অন্য জেলা