Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

শরীয়তপুর জেলা: কীর্তিনাশা, পদ্মার চর আর নদীর জীবন

ঢাকা বিভাগ · ৬টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. এক সংস্কারকের নামে জেলা
  2. বিক্রমপুরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে নতুন জেলা
  3. মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
  4. চর, ভাঙন আর জীবিকা
  5. লোকজ আনন্দ
  6. দেখার মতো কয়েকটি জায়গা
  7. নদীর পাতে ইলিশ, শীতের পাতে গুড়
  8. যাওয়ার পথ ও সময়
  9. সাধারণ প্রশ্ন

বাংলার নদীর নামের মধ্যে "কীর্তিনাশা" সম্ভবত সবচেয়ে বিষণ্ণ। যে নদী মানুষের কীর্তি নাশ করে — এই নাম এমনি এমনি আসেনি। অষ্টাদশ শতকে ঢাকার দেওয়ান রাজা রাজবল্লভ পদ্মার দক্ষিণ পাড়ে রাজনগর নামে এক জমকালো জনপদ গড়েছিলেন; মঠ, মন্দির, দিঘি আর প্রাসাদে সাজানো সেই নগর উনিশ শতকে পদ্মার ভাঙনে নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। সেই থেকে পদ্মার এই শাখাকে লোকে কীর্তিনাশা বলে ডাকে বলে প্রচলিত আছে। রাজনগরের অবস্থান ছিল আজকের শরীয়তপুর জেলার জাজিরা-নড়িয়া অঞ্চলের কাছাকাছি। শরীয়তপুর তাই এমন এক জনপদ, যার ইতিহাস যতটা মাটিতে লেখা, তার চেয়ে বেশি লেখা নদীর স্রোতে। ছয়টি উপজেলা নিয়ে এই জেলা: শরীয়তপুর সদর, নড়িয়া, জাজিরা, ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা আর গোসাইরহাট।

এক সংস্কারকের নামে জেলা

অনেক জেলার নাম এসেছে রাজা, নদী বা বাজার থেকে, কিন্তু শরীয়তপুরের নাম এসেছে একজন ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারকের নামে। হাজী শরীয়তউল্লাহ উনিশ শতকের শুরুর দিকে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে ফরায়েজি আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি জমিদার ও নীলকরদের অন্যায় করের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিল। তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়েই এ অঞ্চলের নাম রাখা হয় শরীয়তপুর। জেলা সদরের এলাকাটি আগে পালং নামে পরিচিত ছিল, আর পালং নামে একটি নদীও জেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে।

বিক্রমপুরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে নতুন জেলা

ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চল বিক্রমপুরের দক্ষিণাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। মোগল আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম কেদার রায়ের নাম এই অঞ্চলের লোকস্মৃতিতে এখনো উচ্চারিত হয়। নড়িয়ার ফতেজংপুরে একটি পুরোনো দুর্গের ধ্বংসাবশেষ এ অঞ্চলের মধ্যযুগীয় অতীতের দিকে ইঙ্গিত দেয়।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে এলাকাটি ছিল ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার অংশ। মাদারীপুরের পূর্বাংশ নিয়ে প্রথমে মহকুমা এবং পরে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ শরীয়তপুর পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এই মাটিতে জন্মেছিলেন পুলিন বিহারী দাশ, যিনি ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সংগঠন ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। স্বদেশি যুগের সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নাম গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

১৯৭১ সালে শরীয়তপুরের প্রায় সব উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা আর পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। নড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা থানায় আক্রমণ চালিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করেন; প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি সেনারা আশপাশের গ্রামে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। ডামুড্যা কলেজের কাছে এক লড়াইয়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। গোসাইরহাট, ভেদরগঞ্জ আর জাজিরাতেও একাধিক সম্মুখযুদ্ধ হয়। মহিষারে একটি গণকবর আজও সেই দিনের সাক্ষ্য বহন করছে।

চর, ভাঙন আর জীবিকা

শরীয়তপুরকে বুঝতে হলে চর বুঝতে হবে। পদ্মা আর মেঘনা জেলার সীমানা ঘিরে রেখেছে, ভেতরে বয়ে গেছে কীর্তিনাশা, পালং আর জয়ন্তী। বর্ষায় নদী ফুলে ওঠে, তীর ভাঙে, আবার শুকনো মৌসুমে নতুন চর জেগে ওঠে। নড়িয়ার পদ্মাতীরের ভাঙন জাতীয় সংবাদেও বারবার এসেছে; বাজার, স্কুল আর বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হওয়ার ঘটনা এখানকার মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতা।

তবু এই পলিমাটিই জেলার শক্তি। কৃষি এখানকার প্রধান জীবিকা — ধান, পাট, গম, পেঁয়াজ, আদা, মিষ্টি আলু আর টমেটো প্রচুর হয়। পাট, পেঁয়াজ, আদা আর টমেটো জেলা থেকে অন্যত্র যায়। পদ্মা-মেঘনার মাছ ধরা বহু পরিবারের জীবিকার ভরসা, আর বিদেশে কর্মরত স্বজনদের পাঠানো টাকাও অনেক সংসারের বড় অবলম্বন। শিল্পকারখানা এখানে কম, তবে পদ্মা সেতু চালুর পর জাজিরা প্রান্তে নতুন সড়ক, বাজার আর ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

চরের জীবন কঠিন হলেও তার নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। শুকনো মৌসুমে নতুন জাগা চরে কাশফুল ফোটে, জেলেরা নদীর ধারে জাল শুকাতে দেন, আর খেয়ানৌকায় মানুষ, গরু-ছাগল আর হাটের মালপত্র একসঙ্গে পার হয়। এখানকার মানুষ নদীকে যেমন ভয় পান, তেমনি ভালোও বাসেন — কারণ এই নদীই তাঁদের মাছ দেয়, পলি দেয়, আবার কেড়েও নেয়।

লোকজ আনন্দ

শরীয়তপুরের গ্রামীণ উৎসবগুলোতে নদীর ছাপ স্পষ্ট। বর্ষায় নৌকাবাইচ হয়, পহেলা বৈশাখ আর চৈত্রসংক্রান্তিতে মেলা বসে। জারিগান, কবিগান আর বিয়ের গীত এখানকার লোকসংগীতের পরিচিত ধারা; যাত্রাপালাও একসময় শীতের রাতের প্রধান বিনোদন ছিল। হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট আর দাড়িয়াবান্ধার মতো খেলা গ্রামের মাঠে এখনো দেখা যায়। একসময় পৌষ আর চৈত্রসংক্রান্তিতে ষাঁড়ের লড়াইয়ের আয়োজনও হতো, যা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত। নদীভাঙনে বারবার ঘর হারানো মানুষের গানে তাই আক্ষেপের সুর যেমন আছে, তেমনি আছে নতুন করে বাঁচার জেদ।

দেখার মতো কয়েকটি জায়গা

  • জাজিরা প্রান্ত থেকে পদ্মা সেতু ও নদীর দৃশ্য — বিকেলের আলোয় সবচেয়ে সুন্দর।
  • নড়িয়ার সুরেশ্বর দরবার শরীফ — বহু ভক্তের আনাগোনার এক পুরোনো আধ্যাত্মিক কেন্দ্র।
  • রুদ্রকর মঠ — সদরের কাছে উঁচু চূড়ার পুরোনো মঠ।
  • কার্তিকপুর ও হাটুরিয়ার জমিদার বাড়ি — জমিদারি আমলের স্থাপত্যের নিদর্শন।
  • ধানুকার মনসা বাড়ি — লোকধর্মের এক পুরোনো তীর্থ।

নদীর পাতে ইলিশ, শীতের পাতে গুড়

শরীয়তপুরের খাবারের কেন্দ্রে আছে পদ্মা আর মেঘনা। বর্ষার শেষে জেলেদের নৌকায় যখন ইলিশ ওঠে, তখন গ্রামের প্রায় প্রতিটি রান্নাঘরে ইলিশ ভাজার গন্ধ ছড়ায়। হলুদ-লবণ মেখে সরিষার তেলে ভাজা ইলিশ, ভাজার পর কড়াইয়ে থেকে যাওয়া তেলটুকু গরম ভাতে মেখে খাওয়া — এ স্বাদ নদীপারের মানুষের কাছে প্রায় উৎসবের মতো। ঘাটের হোটেলগুলোতেও তখন ভাজা ইলিশ আর ডিমওয়ালা ইলিশের চাহিদা বাড়ে।

রোজকার খাবারে মাছের ঝোল অপরিহার্য — চরের খাল-বিলের ছোট মাছ, পাঙাশ, বোয়াল কিংবা চিংড়ি, সঙ্গে আলু, লাউ বা কাঁচকলা। জেলায় প্রচুর আদা আর পেঁয়াজ হয় বলে ঝোলের মসলাও হয় তাজা আর ঝাঁঝালো।

শীত এলে খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধা শুরু হয়। ভোরে গাছিরা রস নামান, সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় দানাদার আর ঝোলা খেজুরের গুড়। এই গুড় দিয়ে ভাপা পিঠা, পায়েস আর চিতই পিঠা গুড়ে ডুবিয়ে খাওয়া চলে পুরো শীতজুড়ে। আরও খাবারের খবর পাবেন শরীয়তপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

যাওয়ার পথ ও সময়

পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে শরীয়তপুর যাওয়া অনেক সহজ হয়েছে; সড়কপথে মাওয়া হয়ে সেতু পার হয়ে জাজিরা দিয়ে জেলা শহরে পৌঁছানো যায়। সদরঘাট থেকে নদীপথে লঞ্চেও জেলার বিভিন্ন ঘাটে যাওয়ার চল আছে। খেজুরের গুড় আর পিঠার জন্য শীতকাল সেরা সময়, আর ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে বর্ষার শেষভাগ।

সাধারণ প্রশ্ন

শরীয়তপুর জেলার নাম কার নামে রাখা হয়েছে?

ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তউল্লাহর নামে শরীয়তপুর জেলার নামকরণ করা হয়েছে।

কীর্তিনাশা নদীর নাম কেন এমন?

প্রচলিত আছে, পদ্মার এই শাখা রাজা রাজবল্লভের গড়া রাজনগরের মঠ-মন্দির ও প্রাসাদ গ্রাস করেছিল বলে একে কীর্তিনাশা বলা হয়।

শরীয়তপুরের বিখ্যাত খাবার কী?

পদ্মা-মেঘনার ইলিশ ভাজা, নদীর মাছের ঝোল আর শীতের খেজুরের গুড় শরীয়তপুরের সবচেয়ে পরিচিত খাবার।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

শরীয়তপুরের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ শরীয়তপুরের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 ঢাকা বিভাগের অন্য জেলা