শেরপুর জেলা: গারো পাহাড়ের কোলে এক সীমান্ত জনপদ
ময়মনসিংহ বিভাগ · ৫টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট
এই লেখায় যা আছে
একসময় ব্রহ্মপুত্র পার হতে খেয়াঘাটে মাশুল দিতে হতো দশ কাহন কড়ি। সেই মাশুলের নাম থেকেই প্রচলিত আছে, নদীর ওপারের এলাকাটির নাম হয়েছিল দশকাহনিয়া। আজকের শেরপুর জেলা সেই দশকাহনিয়ারই উত্তরসূরি। ময়মনসিংহ বিভাগের সবচেয়ে উত্তরের এই জেলার মাথায় গারো পাহাড়, যার ওপারে ভারতের মেঘালয়। সমতলের ধানখেত থেকে হঠাৎ উঠে আসা লালমাটির টিলা, শালবন, পাহাড়ি ঝর্ণার ধারা আর গারো-হাজং-কোচ জনগোষ্ঠীর গ্রাম মিলে শেরপুর এক বৈচিত্র্যময় সীমান্ত জনপদ।
দশকাহনিয়া থেকে শেরপুর
নামবদলের গল্পটা জমিদারির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে এলাকাটি দশকাহনিয়া বাজু নামে পরিচিত ছিল বলে জানা যায়। পরে ভাওয়ালের গাজী পরিবার এ অঞ্চলের জমিদারি লাভ করে। প্রচলিত আছে, এই গাজী বংশের শেষ জমিদার শের আলী গাজীর নাম থেকেই এলাকার নাম হয় শেরপুর। আরও আগে এ অঞ্চল প্রাচীন কামরূপ রাজ্যের অংশ ছিল বলে ধারণা করা হয়।
বিদ্রোহের মাটি
শেরপুরের ইতিহাসে বারবার কৃষক আর সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের কথা আসে। আঠারো শতকের শেষে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের প্রভাব এখানে পড়েছিল। উনিশ শতকের গোড়ায় টিপু শাহের নেতৃত্বে পাগলপন্থী আন্দোলন জমিদার ও কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলে বড় সাড়া জাগায়; গারো ও হাজং কৃষকেরাও এতে যুক্ত হন। বিশ শতকের শুরুতে কামারের চরে একাধিক কৃষক সম্মেলন হয়। ১৮৯৭ সালের বড় ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ বদলে যাওয়ায় এলাকার ভূগোল ও জনবসতিতেও পরিবর্তন আসে।
ব্রিটিশ আমলে শেরপুর ছিল ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার অধীন একটি থানা; ১৮৬৯ সালে শেরপুর পৌরসভা গঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে এটি মহকুমা হয় এবং ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়।
মুক্তিযুদ্ধে শেরপুরের সীমান্ত এলাকা ছিল সক্রিয় রণাঙ্গন। নালিতাবাড়ীর সোহাগপুরে জুলাই মাসে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামের পুরুষদের ব্যাপক হারে হত্যা করে; এত মানুষ মারা যান যে গ্রামটি পরে বিধবাপল্লী নামে পরিচিত হয়। শেরপুর সদরের সূর্যদীতেও নভেম্বরে গণহত্যা হয়। নালিতাবাড়ীর একটি সংঘর্ষে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাজমুল আহসানসহ কয়েকজন শহীদ হন, আর নকলাতেও বিভিন্ন সংঘর্ষে মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দেন।
পাহাড়, নদী আর ধানের মাঠ
শেরপুরের উত্তর অংশ, বিশেষ করে ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী আর শ্রীবরদী, গারো পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত। এখানে উঁচু-নিচু টিলা, শাল-গজারির বন আর পাহাড় থেকে নামা ছোট নদী ও ঝোরা। দক্ষিণে সমতল পলিভূমি, যেখানে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ভোগাই, চেল্লাখালী ও কংস নদী বয়ে গেছে। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে নদীগুলো হঠাৎ ফুলে ওঠে।
জেলার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। ধান, পাট, গম, সরিষা, আলু আর সবজির পাশাপাশি এখানে সুগন্ধি তুলসীমালা ধানের চাষ বিশেষভাবে পরিচিত; ২০২৩ সালে শেরপুরের তুলসীমালা চাল ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় অনেক পরিবার আদা, হলুদ, কাঁঠাল আর আনারস চাষ করে। সেখানে রাবার বাগান ও বনজ সম্পদও আছে, আর ভোগাই ও অন্য নদীতে রাবার ড্যাম বানিয়ে সেচের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পাহাড়ের মানুষ, সমতলের সুর
গারো পাহাড়ের পাদদেশে শত শত বছর ধরে গারো, হাজং, কোচ, ডালু, বানাই ও রাজবংশী জনগোষ্ঠীর মানুষ বাস করেন। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, পোশাক, ঘরবাড়ির ধরন আর উৎসব শেরপুরের সংস্কৃতিকে আলাদা রং দিয়েছে। গারোদের ওয়ানগালা উৎসব নবান্নের মতো ফসল তোলার আনন্দ উদ্যাপন। এই সময় গ্রামে ঢোল আর বাঁশির সুরে নাচ হয়, নতুন ফসল থেকে বানানো খাবার আর পানীয় ভাগ করে খাওয়া হয়। গারো সমাজ মাতৃসূত্রীয়, অর্থাৎ সম্পত্তি আর বংশপরিচয় মায়ের দিক থেকে আসে, যা তাদের সামাজিক কাঠামোকে আলাদা করে। ঝিনাইগাতীর মরিয়মনগর মিশনের মতো প্রতিষ্ঠান এই অঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। সমতলের গ্রামে ভাটিয়ালি, জারি আর পালাগান এখনো শোনা যায়। জেলায় মসজিদ, মন্দির আর গির্জা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে; শহরের কেন্দ্রেই মসজিদ আর মন্দিরের সহাবস্থান চোখে পড়ে।
যেখানে মন ভরবে
শেরপুরে বেড়াতে আসা মানুষের প্রথম গন্তব্য সাধারণত পাহাড়ি অঞ্চল। গজনীতে টিলার ঢাল বেয়ে উঠলে সীমান্তের ওপারের পাহাড়সারি চোখে পড়ে, লেকে নৌকা চলে, আর শীতের ছুটিতে পরিবার নিয়ে পিকনিকের ভিড় জমে। মধুটিলায় আবার বন অনেকটা ঘন, ভোরে গেলে পাখির ডাক শোনা যায়। সংক্ষেপে জায়গাগুলো:
- ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশ কেন্দ্র, টিলা, লেক আর শালবনের মাঝে
- নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্ক, যার ওয়াচটাওয়ার থেকে সীমান্তের পাহাড় দেখা যায়
- ভোগাই নদীর রাবার ড্যাম ও নদীর তীরের গ্রাম
- শহরের মাই সাহেবা মসজিদ এবং পুরোনো গোপীনাথ ও অন্নপূর্ণা মন্দির
- পুরোনো ঘাগড়া খান বাড়ি মসজিদ
ছানার পায়েস আর সুগন্ধি চালের গল্প
শেরপুরের খাবারের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছানার পায়েস। ব্রিটিশ আমলে শহরের ঘোষপট্টির মিষ্টি কারিগরেরা এটি বানাতে শুরু করেন বলে জানা যায়। দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন ক্ষীর বানানো হয়, আলাদা করে ছানার ছোট ছোট গুটি চিনির রসে ভিজিয়ে সেই ক্ষীরে মৃদু আঁচে ফোটানো হয়। ঘন, ক্রিমের মতো এই মিষ্টি ২০২৪ সালে জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে, আর শহরের অনেক মিষ্টির দোকানেই এটি পাওয়া যায়।
তুলসীমালা চালের কল্যাণে শেরপুরের পোলাও আর পায়েসের সুবাসও আলাদা। ছোট দানার এই সুগন্ধি চালে রাঁধা পোলাও বিয়ে-শাদি আর উৎসবের প্রধান পদ। শীতকালে নতুন চালের গুঁড়ায় ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা আর নানা পিঠা হয়; গারো পরিবারগুলোতেও চালের তৈরি নিজস্ব পিঠা ও খাবারের ঐতিহ্য আছে। দোকান ও পদের বিস্তারিত পাবেন শেরপুরের বিখ্যাত খাবার পাতায়।
শেরপুরের গ্রামের রান্নায় পাহাড় আর সমতল দুটোরই ছাপ। সমতলে নদী আর বিলের মাছ দিয়ে ঝোল, শাক আর ভর্তা প্রতিদিনের খাবার; পাহাড়ি এলাকায় গারো পরিবারগুলোতে বাঁশ কোড়ল, শুঁটকি আর বনজ শাকসবজির ব্যবহার বেশি। শীতের সকালে খেজুরের রস আর ভাপা পিঠা বিক্রির দোকান শহরের মোড়ে মোড়ে বসে যায়। বিয়ের দাওয়াতে তুলসীমালার পোলাওয়ের পরে শেষ পাতে ছানার পায়েস না থাকলে আয়োজন যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়।
কীভাবে যাবেন, কখন যাবেন
ঢাকা থেকে শেরপুরে সাধারণত সড়কপথে বাসে যাওয়া হয়, ময়মনসিংহ হয়ে। পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরতে শীতকাল সবচেয়ে ভালো; তখন আবহাওয়া শুকনো, পথ চলাচলের উপযোগী, আর পিঠা ও নতুন চালের মৌসুম চলে। বর্ষায় পাহাড় সবুজ হয়ে ওঠে, তবে পাহাড়ি ঢলের সময় সাবধান থাকা দরকার।
সাধারণ প্রশ্ন
শেরপুর নামটি কোথা থেকে এসেছে?
প্রচলিত আছে, ভাওয়ালের গাজী বংশের শেষ জমিদার শের আলী গাজীর নামে শেরপুর নাম হয়েছে। এর আগে এলাকাটি দশকাহনিয়া নামে পরিচিত ছিল।
শেরপুরের কোন খাবার জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে?
শেরপুরের তুলসীমালা চাল ২০২৩ সালে এবং ছানার পায়েস ২০২৪ সালে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
শেরপুরে বেড়ানোর জনপ্রিয় জায়গা কোনগুলো?
ঝিনাইগাতীর গজনী অবকাশ কেন্দ্র ও নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্ক সবচেয়ে জনপ্রিয়। গারো পাহাড়ের পাদদেশের আদিবাসী গ্রাম আর শহরের পুরোনো মসজিদ-মন্দিরও দেখার মতো।
প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh