Foodie Bangladesh🎴 কার্ড বানান

সিরাজগঞ্জ জেলা: যমুনার তীরে তাঁত আর দুধের দেশ

রাজশাহী বিভাগ · ৯টা উপজেলা · পড়তে ৪ মিনিট

এই লেখায় যা আছে
  1. জমিদার সিরাজ আলীর গঞ্জ
  2. নদীর খেয়ালে গড়া ইতিহাস
  3. যমুনা, চলনবিল আর চরের জীবন
  4. তাঁতের সুর, রবীন্দ্রনাথের শাহজাদপুর
  5. যেখানে থামতে হয়
  6. দুধের দেশে দই, মাছ আর পিঠা
  7. পৌঁছানো ও সেরা সময়
  8. সাধারণ প্রশ্ন

বেলকুচি বা এনায়েতপুরের কোনো গ্রামে ঢুকলে প্রথমে কানে আসে খটখট শব্দ। ঘরের ভেতর, বারান্দায়, টিনের চালার নিচে একের পর এক তাঁত চলছে, সুতোয় রং লাগানো হচ্ছে উঠোনে, রাস্তার ধারে শুকাচ্ছে লুঙ্গি আর শাড়ির থান। এই শব্দই সিরাজগঞ্জ জেলার নিজস্ব সুর। রাজশাহী বিভাগের পূর্ব প্রান্তে, যমুনার পশ্চিম তীরে এই জেলা। ঢাকা থেকে যমুনা সেতু পার হলেই সিরাজগঞ্জ, তাই একে বলা হয় উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার। তাঁতের পাশাপাশি দুধ, দই আর গবাদিপশুর জন্যও জেলাটি বিখ্যাত।

জমিদার সিরাজ আলীর গঞ্জ

প্রচলিত আছে, সিরাজগঞ্জের নাম এসেছে জমিদার সিরাজ আলী চৌধুরীর নাম থেকে। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে সোহাগপুরের এই জমিদার বড়বাজু পরগনার একটি অংশের ইজারা পান, যা সিরাজগঞ্জ জমিদারি নামে পরিচিত হয়। যমুনার পাড়ে তাঁর প্রতিষ্ঠিত গঞ্জ বা বাজার থেকেই পরে শহরের নাম দাঁড়ায় সিরাজগঞ্জ।

নদীর খেয়ালে গড়া ইতিহাস

সিরাজগঞ্জের ইতিহাস যমুনার সঙ্গে গাঁথা। এই অঞ্চল দীর্ঘদিন বন্যাপ্রবণ ও কম জনবসতির ছিল। সুফি সাধকদের আগমনের সঙ্গে এখানে ইসলামের প্রসার ঘটে বলে স্থানীয় ইতিহাসে বলা হয়। ব্রিটিশ আমলে ১৮৪৫ সালে সিরাজগঞ্জ ময়মনসিংহ জেলার মহকুমা হয়। যমুনা গতিপথ বদলালে ১৮৫৫ সালে মহকুমাটি পাবনা জেলায় যুক্ত হয়। উনিশ ও বিশ শতকে সিরাজগঞ্জ ছিল পাট ব্যবসার বড় নদীবন্দর, কলকাতা থেকে স্টিমার আসত এখানে। ১৯৮৪ সালে সিরাজগঞ্জ পূর্ণাঙ্গ জেলা হয়।

এই জেলার মাটি থেকে উঠে এসেছেন উপমহাদেশের রাজনীতির কয়েকজন স্মরণীয় মানুষ। কৃষক-শ্রমিকের নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্ম সিরাজগঞ্জের ধানগড়ায়। জাতীয় চার নেতার একজন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং ভাষা আন্দোলনের সময়ের পরিচিত নেতা মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশও সিরাজগঞ্জের সন্তান। গণিতবিদ যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী, যাঁর পাটিগণিত বই একসময় ঘরে ঘরে পড়া হতো, তিনিও এই জেলার।

মুক্তিযুদ্ধে কামারখন্দের পলাশডাঙ্গা যুব শিবির ছিল প্রশিক্ষণ ও প্রতিরোধের এক কেন্দ্র। এপ্রিলে উল্লাপাড়ার ঘাটিনা সেতুর কাছে প্রতিরোধযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে লড়েন। নভেম্বরে তাড়াশের নওগাঁয় বড় যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের বড় ক্ষতি হয়। চৌহালী মুক্ত হয় নভেম্বরের শেষে, আর ১৪ ডিসেম্বর পুরো জেলা শত্রুমুক্ত হয়। কাজীপুরের বড়ইতলা ও তাড়াশের আসবাড়িয়ায় গণকবর আছে।

যমুনা, চলনবিল আর চরের জীবন

সিরাজগঞ্জের পূর্ব সীমা ধরে বয়ে গেছে বিশাল যমুনা। কাজীপুর, চৌহালী আর বেলকুচির চরে মানুষ বর্ষায় নদীর সঙ্গে লড়ে, শুকনো মৌসুমে সেই চরেই ফলায় বাদাম, মরিচ আর কাউন। ভাঙন এখানে প্রতি বছরের বাস্তবতা। জেলার পশ্চিমে তাড়াশ উপজেলায় চলনবিলের অংশ, আর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ইছামতী, বড়াল ও হুরাসাগর।

অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি হলেও শিল্পে সিরাজগঞ্জের অবদান অন্য অনেক জেলার চেয়ে বেশি, যার বড় অংশ তাঁত। বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ায় হাজারো তাঁতে লুঙ্গি, শাড়ি আর গামছা তৈরি হয়, যা দেশজুড়ে বাজারে যায়। দুধেও সিরাজগঞ্জের সুনাম; শাহজাদপুরের বাঘাবাড়িতে দেশের সরকারি দুগ্ধ প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটার বড় কারখানা, আর চরাঞ্চলের বাথানে গরু পালন বহু পরিবারের জীবিকা। কোরবানির পশুর বাজারেও সিরাজগঞ্জের গরু পরিচিত।

তাঁতপল্লির জীবনটা কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় এর পেছনে কত হাত কাজ করে। কেউ সুতা কেনেন হাট থেকে, কেউ নলিতে সুতা জড়ান, নারীরা চরকায় সুতা প্রস্তুত করেন, পুরুষেরা তাঁতে বসেন। এনায়েতপুর আর শাহজাদপুরের কাপড়ের হাটে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে দেশের নানা জায়গা থেকে পাইকার আসেন, আর ঈদ বা পূজার আগে সেই হাটের ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। হস্তচালিত তাঁতের পাশাপাশি এখন বিদ্যুৎচালিত তাঁতও অনেক জায়গায় চলছে।

তাঁতের সুর, রবীন্দ্রনাথের শাহজাদপুর

শাহজাদপুরে ঠাকুর পরিবারের জমিদারির কাছারিবাড়ি ছিল। জমিদারি দেখাশোনার জন্য রবীন্দ্রনাথ এখানে এসেছেন বারবার, এবং এখানকার গ্রামজীবন তাঁর গল্প, কবিতা ও চিঠিপত্রে ছায়া ফেলেছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। কাছারিবাড়িটি এখন জাদুঘর, আর কবির জন্মদিনে এখানে উৎসব হয়।

সিরাজগঞ্জের লোকসংস্কৃতিতে লোকগান, নৌকাবাইচ আর লাঠিখেলা বড় জায়গা নিয়ে আছে। বর্ষায় যমুনা আর চলনবিলে নৌকাবাইচ দেখতে নদীপাড়ে মানুষের ঢল নামে।

যেখানে থামতে হয়

যমুনা সেতু আর তার পশ্চিম প্রান্তের এলাকা থেকে নদীর বিস্তার দেখা যায় সবচেয়ে ভালো। শহরের কাছে যমুনার তীরে চায়না বাঁধ সন্ধ্যায় বেড়ানোর প্রিয় জায়গা। শাহজাদপুরের রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি, উল্লাপাড়ার হাটিকুমরুলে কয়েক শতাব্দী পুরোনো নবরত্ন মন্দির, যার নয়টি চূড়া আর পোড়ামাটির অলংকরণ মুঘল আমলের মন্দির স্থাপত্যের ছাপ বহন করে। এনায়েতপুরে তাঁতপল্লি ঘুরে দেখা যায়, সেখানে এনায়েতপুরী পীরের মাজারও আছে। শহরের পুরোনো ইলিয়ট ব্রিজ আর তাড়াশের চলনবিলও দেখার মতো।

দুধের দেশে দই, মাছ আর পিঠা

এত দুধ যে জেলায়, সেখানে মিষ্টি দই প্রতিদিনের খাবার। সিরাজগঞ্জের সবচেয়ে মজার খাদ্য-উৎসব হলো দই মেলা। শীতের মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমীর দিন সিরাজগঞ্জ শহর আর তাড়াশে বসে এই মেলা, যার বয়স প্রায় তিন শ বছর বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। প্রচলিত আছে, এক জমিদার অতিথিদের দই খাওয়াতে আর সেরা দইয়ের কারিগরকে পুরস্কার দিতে এই মেলার সূচনা করেন। এখন বগুড়া, পাবনা, নাটোর থেকেও ঘোষেরা সরা ভরে দই নিয়ে আসেন, সারি সারি মাটির পাত্রে ক্ষীরসা দই, টক দই আর নানা নামের দই সাজানো থাকে। ক্রেতারা দোকান থেকে দোকানে ঘুরে চেখে দেখেন, দরদাম করেন, তারপর সরা হাতে বাড়ি ফেরেন। সেদিন শহরের অনেক বাড়িতে আত্মীয়দের দই উপহার দেওয়ার রেওয়াজও আছে। টক দই আবার রান্নায় আর ঘোল বানাতে কাজে লাগে, গরমের দিনে লবণ-চিনি মেশানো ঘোল এখানকার জনপ্রিয় পানীয়।

যমুনা আর চলনবিলের জেলা বলে মাছের ঝোল এখানে রোজকার খাবার। বর্ষায় দেশি মাছ, চরের নদীতে বাঘাইড়, চিংড়ি আর পাবদা; পাতলা ঝোলে কাঁচা মরিচ আর ধনেপাতা দিয়ে রান্না। শীতে নতুন চালের গুঁড়ায় ভাপা, চিতই আর দুধ চিতই, খেজুর গুড় আর ঘন দুধে ভেজানো, গ্রামের উঠোনে উৎসবের মতো আয়োজন। এসবের খোঁজ পাবেন সিরাজগঞ্জের বিখ্যাত খাবার পাতায়।

পৌঁছানো ও সেরা সময়

ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ সড়কপথে খুব কাছে, যমুনা সেতু পার হলেই জেলার সীমা। রেলপথেও যাওয়া যায়, উত্তরবঙ্গগামী ট্রেন যমুনা পেরিয়ে সিরাজগঞ্জের ভেতর দিয়ে যায়। দই মেলা দেখতে চাইলে শ্রীপঞ্চমীর সময়, সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে যান; যমুনার রূপ আর নৌকাবাইচের জন্য বর্ষার শেষ ভাগ ভালো।

সাধারণ প্রশ্ন

সিরাজগঞ্জ কেন তাঁতের জন্য বিখ্যাত?

বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ায় হাজারো তাঁতে লুঙ্গি, শাড়ি ও গামছা তৈরি হয়। এ কারণে সিরাজগঞ্জকে তাঁতের শহর বলা হয়।

সিরাজগঞ্জের দই মেলা কখন হয়?

প্রতি বছর মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমীর দিন সিরাজগঞ্জ শহর ও তাড়াশে দই মেলা বসে। আশপাশের জেলা থেকেও বিক্রেতারা দই নিয়ে আসেন।

সিরাজগঞ্জ নামের উৎস কী?

প্রচলিত আছে, অষ্টাদশ শতকের জমিদার সিরাজ আলী চৌধুরীর নাম থেকে সিরাজগঞ্জ নামের উৎপত্তি। তাঁর জমিদারি সিরাজগঞ্জ জমিদারি নামে পরিচিত ছিল।

প্রকাশ: ২৩/১০/২০২৬ · Foodie Bangladesh

সিরাজগঞ্জের খাবারের গাইডবিখ্যাত খাবার আর এলাকার মানুষের বলা সেরা জায়গাগুলো এক পাতায়। 🍽️ সিরাজগঞ্জের খাবার দেখুন 🗺️ পেটুকের ম্যাপ

🧭 রাজশাহী বিভাগের অন্য জেলা